তানভীর হাসান
প্রকাশ : ১৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৮ এএম
ছবি: সংগৃহীত
মিরপুরের পল্লবীতে দোকানে ঢুকে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার ঘটনায় ফের প্রকাশ্যে এসেছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের কানেকশন। এ ঘটনায় জনিকে গ্রেপ্তারের পর কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া অপর দুই খুনি পাতা সোহেল ও দর্জি মাসুম ওরফে ভাগ্নে মামুনের নাম সামনে এসেছে। নির্দেশদাতার তালিকায় রয়েছে মিরপুরের ফোরস্টার গ্রুপের দুই ভাই মশিউর ও মামুন। তারা পুলিশের খাতায় শীর্ষ সন্ত্রাসী।
পুলিশের তথ্যে জানা যায়, দুবাই বসেই হত্যার নির্দেশ দেয় মামুন। আর তা বাস্তবায়ন করে মামুনেরই ছোট ভাই মশিউরের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত জনি, পাতা সোহেল ও দর্জি মাসুম। মিরপুরের সবুজবাংলা ও বাউনিয়াবাধ এলাকায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের এই সদস্যদের চাঁদাবাজিতে বাধা দেওয়ায় কিবরিয়াকে খুন করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘খুনিদের শনাক্ত করা গেছে। আশা করছি, দ্রুতই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকি দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।’
ঘটনার নেপথ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগসূত্র থাকতে পারে জানিয়ে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে অন্তত শতাধিক সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে খুনিদের সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেছে। তারা পরিচয় আড়াল করতে হেলমেট ব্যবহার করলেও নিজেদের আড়াল করতে পারেনি। এখন খুনিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে এর নেপথ্যে কারা আছে তা বেরিয়ে আসবে।’
জানা যায়, চলতি মাসের ১০ তারিখে রাজধানীর পুরান ঢাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে হত্যার রেশ না কাটতেই এবার মিরপুরে দোকানে ঢুকে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার ফুটেজ ভাইরাল হওয়ায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়। নিহত কিবরিয়া পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন। স্থানীয়রা জানান, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার থাকায় তিনি এলাকাতেও জনপ্রিয় ছিলেন। সম্প্রতি মিরপুরের ফোরস্টার গ্রুপের সদস্য হিসেবে পরিচিত মামুন ও মশিউরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল মিরপুরের সবুজবাংলা ও বাউনিয়াবাধ এলাকায় ব্যবসায়ীদের কাছে বেপরোয়া চাঁদাবাজির। তারা সম্পর্কে আপন দুই ভাই। আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাদের সক্রিয়তা বাড়ার পর পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারে তৎপর হলে বিষয়টি আঁচ করে দুই ভাই দেশ ছেড়ে চলে যায় দুবাই। সেখানে বসেই তারা নিয়ন্ত্রণ করত চাঁদাবাজি। সম্প্রতি তাদের চাঁদাবাজিতে বাধা হয়ে দাঁড়ান নিহত যুবদল নেতা কিবরিয়া। এ ছাড়া কিছুদিন আগে পল্লবী এলাকায় একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গুলি করে চাঁদা দাবির একটি ফুটেজ ভাইরাল হলে সেখানেও মামুনের ক্যাডারদের শনাক্ত করতে পুলিশকে সহায়তা করেন কিবরিয়া। এ নিয়েও কিবরিয়ার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল মামুন ও মশিউর।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এজন্যই কিবরিয়াকে সরিয়ে দিতে মশিউর তার ক্যাডারদের জড়ো করে। গত কিছুদিন ধরেই তারা কিবরিয়ার চলাফেরা নজরদারি করে নিশ্চিত হয় যে, প্রতিদিন সন্ধ্যায় পল্লবীর সেকশন-১২, ব্লক-সি এলাকায় বন্ধুর দোকানে কিবরিয়া আড্ডা দেন। গত রোববার সন্ধ্যায় কিবরিয়া ওই দোকানে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে উপস্থিত হয়ে তিন খুনি উপর্যুপরি গুলি করে মাত্র ১০ সেন্ডের মধ্যেই মিশন শেষ করে। এরপর তাদের একজন বাইক নিয়ে দ্রুত চলে যায়। অন্য দুজন একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় উঠলে জনতা ধাওয়া করে। এ সময় দ্রুত রিকশা না চালানোয় আরিফ নামে ওই অটোরিকশার চালককেও গুলি করা হয়। আহত অবস্থায় আরিফ এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
পরে স্থানীয়রা ধাওয়া দিয়ে জনিকে আটক করে পুলিশে দিলে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে খুনের আদ্যোপান্ত। পুলিশ জানায়, হেলমেট মাথায় চাদর গায়ে যাকে গুলি করতে দেখা যাচ্ছে তার নাম দর্জি মাসুম। নীল শার্ট পরিহিত প্রথম যে ব্যক্তি গুলি ছুড়তে ছুড়তে দোকানে প্রবেশ করছে তার নাম পাতা সোহেল। আর মিশনে অংশ নেওয়া চেক শার্ট পড়া ব্যক্তির নাম জনি। এই জনি এখন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন ওরফে ধ ব্লকের মামুন, কিলার ইব্রাহিম, শাহাদাত ও সিন্ডিকেট মুক্তার মিলে গড়ে তোলে ফোর স্টার গ্রুপ। তারা চারজনই বিদেশে বসে গোটা মিরপুরকে চার ভাগে ভাগ করে চালায় অপরাধ সাম্রাজ্য। এর মধ্যে মামুনের নিয়ন্ত্রণেÑ মিরপুর ১২, পল্লবী, বাউনিয়া ও সাগুফতা; ইব্রাহিমের নিয়ন্ত্রণেÑ মিরপুর ১৩, ১৪, ভাসানটেক ও কালশী; শাহাদাতের নিয়ন্ত্রণেÑ মিরপুর ১, ২, ৬ ও ৭ এবং মুক্তারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মিরপুর ১০ ও ১১। এসব এলাকার চাঁদাবাজি, মাদক কারবার থেকে শুরু করে হেন অপকর্ম নেই, যা তারা করছে না। যদিও এসব নিয়ে ভয়ে কেউই প্রকাশ্যে কথা বলতে আগ্রহী নয়।
জানা যায়, ফোর স্টার গ্রুপের গডফাদাররা বিদেশে থাকলেও দেশের মাটিতে তাদের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে অন্তত শতাধিক ক্যাডার।
এর মধ্যে, মামুন বাহিনীর হয়ে দেশের মাটিতে তার অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেÑ তারই বড় ভাই জামিল, ছোট ভাই মশিউর (দুবাই), রফিকুল, শহিদুল, নাটা আলমগীর, কালা মোতালেব, দেলোয়ার হোসেন রুবেল, রাজন, সানি, ভাগ্নে মামুন ওরফে মাসুম, সোহেল, কায়েস। কিলার ইব্রাহিমের হয়ে কাজ করছেÑ যুবরাজ, সাবু, শাকিল, ভাগ্নে সোহেল, কালা ইব্রাহিম, জনি। শাহাদাতের হয়েÑ টিপু সুমন, ফিটিং শিশির, বিহারি নিলা, প্রচার সাইফুল, পিচ্চি আলামিন, শামিম। মুক্তারের হয়েÑ তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে, হাড্ডি সোহাগ, নওশাদ, আশিক, ডাসা শরিফ, এলেক্স জুয়েল, শুটার জাকির, তপু, আমিন, রকি, ছোট রাকিব, শাহাপরান, মিঠু, আতিকসহ আরও অনেকে।