প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১১:১৪ এএম
আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৪২ পিএম
ছাত্রী বর্ষার অনুরোধেই প্রেমিক মাহির নিজ হাতে খুন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. জোবায়েদ হোসেনকে (২৫)। আর এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয় এক মাস আগে। এরপর তারা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর বউবাজার এলাকা থেকে ৫০০ টাকায় একটি সুইচগিয়ার (ছুরি) কেনেন। ঘটনার দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে পড়াতে এলে নিচতলায় ওঁৎ পেতে থাকা মাহির ও তার বন্ধু আয়লান হামলা চালায় জোবায়েদের ওপর। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। গ্রেপ্তাররা হলেন- মো. মাহির রহমান (১৯), বার্জিস শাবনাম বর্ষা (১৯) ও ফারদীন আহম্মেদ আয়লান (২০)। গতকাল মঙ্গলবার এসব তথ্য জানায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
এদিকে জোবায়েদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষাসহ তিন আসামি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর আসামিরা হলেন- বর্ষার প্রেমিক মো. মাহির রহমান, মাহিরের বন্ধু ফারদীন আহম্মেদ আয়লান। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের পৃথক চার আদালত তাদের জবানবন্দি ও সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। মেহেদী হাসানের আদালতে মাহির, মাসুম মিয়ার আদালতে বর্ষা ও জুয়েল রানার আদালতে আয়লান জবানবন্দি দেন। এর আগে দুপুর আড়াইটার দিকে তাদের আদালতে হাজির করা হয়।
পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, আসামিরা স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বংশাল থানার এসআই মো. আশরাফ হোসেন জবানবন্দি রেকর্ডের আবেদন করেন। আদালত পৃথক চার আদালতে ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দি শেষে তিনজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, পড়াতে গিয়ে জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বর্ষার সঙ্গে আগে থেকেই মাহির রহমানের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এটা মূলত ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। মাহিরকে বর্ষা বলেন যে, জোবায়েদকে না সরালে তিনি মাহিরের হতে পারবেন না। এর পর জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। গ্রেপ্তার দুই আসামি মাহির বর্ষাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য জেনেছে পুলিশ।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের দিন বিকাল ৪টায় জোবায়েদ পড়াতে আসবেন এই তথ্য মাহিরকে জানায় বর্ষা। এই তথ্য জানার পর মাহির তার বন্ধু আয়লানকে নিয়ে আগে থেকেই বাসার নিচের গলিতে অবস্থান নেন। জোবায়েদ বাসার নিচে এসে পৌঁছালে তাদের সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় মাহির বর্ষাকে ছেড়ে দিতে বললে জোবায়েদ অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে মাহির জোবায়েদের গলায় চাকু দিয়ে আঘাত করেন। ছুরি দিয়ে আঘাতের পর জোবায়েদ বাঁচার জন্য সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসে। বেশ কয়েকটি বাসার দরজায় তিনি নক করেন। কেউ খোলেননি। তৃতীয় তলায় এসে তিনি বর্ষার কাছে বাঁচার আকুতি জানান। তবে বর্ষা তাকে সাহায্য করেননি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান জোবায়েদ।
আদালত চত্বরে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
জোবায়েদ হত্যার বিচার দ্রুত সম্পন্ন ও খুনিদের ফাঁসির দাবিতে আদালত চত্বরে বিক্ষোভ করেছে ছাত্রদল। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত চত্বরে ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘জোবায়েদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘খুন হয়েছে আমার ভাই, খুনি তোদের রক্ষা নাই’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই, খুনিদের ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
জবি ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, জোবায়েদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা চাই, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
জবি ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জাফর আহমেদ, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক সুমন সরদার, জবি ছাত্র অধিকারের সভাপতি একেএম রাকিব, আপ বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য ও জবির সংগঠক মাসুদ রানাসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জবির কুমিল্লা জেলা ছাত্র কল্যাণের সভাপতি ও শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। এক বছর ধরে জোবায়েদ হোসেন পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় ১৫, নুরবক্স লেনে রৌশান ভিলা নামের বাসায় বর্ষা নামের এক ছাত্রীকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান পড়াতেন। গত রবিবার বিকালে ওই বাসার তিন তলায় তিনি খুন হন। এর পর সোমবার রাতে কেরানীগঞ্জের ভাংনা এলাকা থেকে মাহির রহমানকে ও পল্টনের চামেলীবাগ এলাকা থেকে ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে আটক করে পুলিশ। তার আগে গত রবিবার রাতেই বংশাল থেকে বার্জিস শাবনাম বর্ষাকে আটক করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার সকালে জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে রাজধানীর বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, মো. জোবায়েদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করাতেন। প্রতিদিনের মতো তিনি ১৯ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বংশালের ৩১নং ওয়ার্ডে নুরবক্স লেনের ১৫নং হোল্ডিং রৌশান ভিলায় পড়ানোর জন্য যান। একই তারিখে সন্ধ্যা প্রায় ৫টা ৪৮ মিনিটের সময় ওই ছাত্রী জোবায়েদ হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই সৈকতকে মেসেঞ্জারের মাধ্যমে জানায় যে, ‘জোবায়েদ স্যার খুন হয়ে গেছে, কে বা কারা জোবায়েদ স্যারকে খুন করে ফেলছে।’ বিষয়টি ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মো. কামরুল হাসান ভুক্তভোগী জোবায়েদের ভাই এনায়েত হোসেনকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানান। পরে এনায়েত তার শ্যালক শরীফ মোহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে ওইদিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ঘটনাস্থল রৌশান ভিলায় পৌঁছান। ওই ভবনের নিচতলা থেকে ওপরে ওঠার সময় তিনি সিঁড়ি এবং দেয়ালে রক্তের দাগ দেখতে পান। ওই ভবনের তৃতীয় তলার রুমের পূর্ব পার্শ্বে সিঁড়িতে গেলে সিঁড়ির ওপর জোবায়েদের রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান। পরে ময়নাতদন্ত শেষে গত ২০ অক্টোবর জোবায়েদকে কুমিল্লার কৃষ্ণপুর গ্রামে দাফন করা হয়।