সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৫:৩৭ পিএম
প্রবা ফটো।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফে মোহাম্মদ ছড়ার বিরুদ্ধে মেঘনা নদীতে বালু উত্তোলনে ইজারাদারের কাছ থেকে দৈনিক এক লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে ড্রেজার জব্দের সময় ইজারাদারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করেন ভুক্তভোগীরা।
চাহিদা মতো চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাফে মোহাম্মদ হয়রানি করে যাচ্ছেন বলে জানান ইজারাদাররা। গত শনিবার ভৈরব প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ইজারাদাররা সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মেঘনার ভৈরব বালুমহালের ইজারাদার মেসার্স নাগিব এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তানভির আহমেদ নাগিব। তিনি ভৈরব উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলামের ছোট ভাই। এর আগে বুধবার একই স্থানে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে একই অভিযোগ করেন তিনি।
এছাড়া, হয়রানি ও চাঁদা দাবির অভিযোগে গত বৃহস্পতিবার ইজারাদার তানভির আহমেদ কিশোরগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ইউএনওর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। আজ রবিবার আদালতে অভিযোগের ওপর শুনানি হওয়ার কথা আছে। এ দিকে গত মঙ্গলবার ইউএনও রাফে মোহাম্মদের গাড়িচালক মমিন মিয়া বাদী হয়ে ইজারা প্রতিষ্ঠানের সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় সরকারি কাজে বাধা ও ইউএনওকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। প্রধান অভিযুক্ত করা হয় ইজারাদারদের একজন তারেক মিয়াকে।
সংবাদ সম্মেলনে ইজারাদার মেসার্স নাগিব এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী তানভির আহমেদ নাগিব বলেন, মেঘনার ভৈরব বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের জন্য মেসার্স নাগিব এন্টারপ্রাইজ গত ১৪ মে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে ১৬ কোটি ৯৪ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকায় ইজারপ্রাপ্ত হয়। ইজারা এলাকা ১, ৬১০.২৫৮ একর নদী। নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ৯ কোটি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার ৯৬৫ ঘনফুট বালু তোলার অনুমতি রয়েছে। ইজারাপ্রাপ্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীর এক প্রান্ত ভৈরব, অপর প্রান্ত আশুগঞ্জ।
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আশুগঞ্জের ইউএনও প্রায়ই নদীতে অভিযান চালান। তার অবৈধ অভিযানের কারণে স্বাভাবিক বালু উত্তোলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ পর্যন্ত একাধিক অভিযান চালিয়ে ইউএনও তাদের ১৪টি ড্রেজার মেশিন ও একটি বাল্কহেড জব্দ করেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভোরে অভিযান চালিয়ে সীমানা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে চারটি খননযন্ত্র ও পাঁচটি বাল্কহেড জব্দ করেন। দুজন লোক ধরে নিয়ে এক বছর করে সাজা দেওয়া হয়। গত মঙ্গলবার অভিযানের সময় ড্রেজারে থাকা ১১ লাখ টাকা নিয়ে নেন ইউএনও। সব মিলিয়ে অনেক টাকার আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছেন তারা। ইউএনও তাদের জানিয়েছেন, বৈধভাবে ইজারাপ্রাপ্ত হলেও ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে চাইলে তাকে দিনে এক লাখ টাকা করে দিতে হবে। তাদের পক্ষে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। এ কারণেই সীমানা লঙ্ঘনের মিথ্যা অভিযোগ এনে বারবার তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
চাঁদা দাবির প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে ইজারাদার তানভির আহমেদ বলেন, ইউএনও প্রমাণ রেখে কিছু করেন না। প্রমাণ না রেখে অনেক কিছু করার সুযোগ আছে। এসব কাজ অতীতে যেভাবে হতো, এখন সেভাবেই হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদীর বালু ব্যবসা এলাকায় কোটি কোটি টাকার বাজার তৈরি করেছে। বৈধ ইজারাদারের পাশাপাশি নানা সময় অবৈধ উত্তোলনকারীরাও সক্রিয় থাকে। এতে প্রায়ই সংঘাতের ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের অভিযানের কারণে অনেক বৈধ ব্যবসায়ীও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে রেললাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি নদী থেকে বালু উত্তোলন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে স্থাপনার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রশাসনের দাবি, নিরাপত্তার স্বার্থে নিয়মিত নজরদারি চালানো হয় এবং সীমানা লঙ্ঘনকারী ড্রেজারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। তবে, ইজারাদারের পক্ষ বলছে, তাদের কার্যক্রম নির্ধারিত সীমানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থান ও ইজারাদারের দাবি একেবারেই ভিন্ন। এদিকে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈধ-অবৈধ উত্তোলনের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সীমারেখা লঙ্ঘন হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে।
ড্রেজার মেশিন ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, নদী থেকে ড্রেজার মেশিন ছিনিয়ে নেওয়া অসম্ভব। ইউএনও মিথ্যা অভিযোগ এনেছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো, একদিকে টাওয়ার ঝুঁকিমুক্ত রাখার কথা বলা হচ্ছে; অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন দরপত্র ছাড়া আশুগঞ্জ প্রান্ত থেকে বালু তোলার অনুমতি দিয়েছে একটি মহলকে। দিনে ১৮টি ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও রাফে মোহাম্মদ ফোনে কথা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ভৈরব ও আশুগঞ্জের দুটি স্থানে নদী থেকে বালু উত্তোলন চলছে। এর মধ্যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জাতীয় গ্রিড লাইনের সন্নিকটে বালু উত্তোলন করা হলে তা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বা জাতীয় গ্রিড লাইনের এক কিলোমিটারের ভেতরে যে কেউ বালু উত্তোলন করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভৈরবে তারা ওই সীমার ভেতরে ড্রেজার বসিয়ে বালু তুলছিল, তাই ড্রেজার ও বাল্কহেড জব্দ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, মেসার্স নাগিব এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও ইজারাদার তানভীর আহমেদ নাগিব। পৌর যুবদলের আহ্বায়ক হানিফ মিয়া, পৌর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক সাজ্জাদ হোসেন মামুন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আরিফুল হক সুজন প্রমুখ।