রাজশাহী বিভাগ
রাজু আহমেদ, রাজশাহী
প্রকাশ : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৮:১৩ পিএম
রাজশাহীর প্রাইমারি ট্রেনিং সেন্টারে সোমবার কর্মশালায় যোগদানকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইজিপি বাহারুল আলম। ছবি : প্রবা
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিভাগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনমনে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। বিভাগের আট জেলার কোনো না কোনো এলাকায় প্রতিদিন হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতি নয়তো জমি দখলের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না।
সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি উত্তরণে চেষ্টার কথা বলা হলেও জনগণ তাতে আশ্বস্ত হতে পারছে না। তারা বলছেন, অপরাধ দমনে দেশজুড়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। অপরাধীদের ধরতে একইসঙ্গে নিয়মিত অভিযানও চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আইন-শৃঙ্খলা ক্রমশ আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। তা হলেও অপরাধ দমনে দৃশ্যত এসব অভিযান কোনো কাজে আসছে বলে মনে হচ্ছে না।
রবিবার রাতে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার শাহপুর, রাজাপুর ও রায়গঞ্জে তিন মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলেন- বেলকুচি উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের কানাই লাল সাহার ছেলে সুভাষ চন্দ্র সাহা ও বগুড়ার ধুনট থানার মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে আব্দুল মমিন। অন্যজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বেলকুচি থানার ওসি জাকারিয়া হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বেলকুচি উপজেলার রাজাপুর গ্রাম থেকে গাছের সঙ্গে ফাঁস দেওয়া অবস্থায় সুভাষ চন্দ্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এর আগে শনিবার রাত ১১টার দিকে নাটোরের বড়াইগ্রামে মাঝগাঁও ইউনিয়নের ধলা মানিকপুর পশ্চিমপাড়ায় বিয়েবাড়িতে সাউন্ড বক্সে উচ্চ শব্দে গান বাজানোয় প্রতিবেশীর মারধরে এক কৃষক নিহত হন। নিহত কামাল বেপারী ওই গ্রামের মৃত ইসমাইল বেপারীর ছেলে।
বড়াইগ্রাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনার পর অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার ক্ষিদ্র লক্ষ্মীপুর গ্রামে শনিবার বেলা ১১ টার দিকে জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে দু’পক্ষের সংঘর্ষে ফেরদৌসী বেগম (৫৫) নামে এক নারী নিহত ও কমপক্ষে ১৫ আহত হন। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজশাহী নগরীর পদ্মাপাড়ে মুখে পলিথিন বাঁধা অবস্থায় এক ব্যবসায়ীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত আবুল বাসার ওরফে মিন্টুর (৩৫) বাড়ি নগরীর মির্জাপুর পূর্বপাড়া মহল্লায়।
নগরীর রাজপাড়া থানার ওসি আশরাফুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাশের ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজনরা তাকে শনাক্ত করেন। এই ঘটনার তিন দিনেও হত্যার মোটিভ উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে গত এক সপ্তাহে রাজশাহী-নওগাঁ ও ঢাকা-রাজশাহী রুটে চারটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী বিআরটিসি বাস ডিপো-সংশ্লিষ্টরা জানান, পাবনা থেকে নওগাঁর সাপাহার রুটে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে ডাকাতের কবলে পড়ে বিআরটিসির একটি বাস। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার পর রাজশাহী-নওগাঁ রুটের বিআরটিসির আরেকটি বাস ডাকাতের কবলে পড়ে কলমিডাঙ্গা এলাকায়। এর তিন দিন পর গত শনিবার রাজশাহী থেকে নিরতপুর যাওয়ার পথে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মদমইল পার হয়ে একটি ব্রিজের কাছে ডাকাতের কবলে পড়ে বিআরটিসির অপর বাস।
গত এক সপ্তাহে রাজশাহী-নওগাঁ রুটে চলাচল করা বিআরটিএর তিনটি বাস ডাকাতের কবলে পড়ে। এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ, গহনা ও মোবাইল ফোন নিয়ে যায় ডাকাতের দল। এছাড়া গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-রাজশাহী রুটের একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা সারা দেশে আলোচনার জন্ম দেয়। যাত্রীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ওই বাসে অর্থ-সম্পদ লুটের পাশাপাশি দুই নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। যদিও ধর্ষণের বিষয়ে থানা বা আদালতে কোনো অভিযোগ করা হয়নি।
১৯ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় বিআরটিসি বাসের চালক সোহেল রানা পোরশা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। রানা তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘এখন এই রুটে চালকরা বাস চালাতে চাচ্ছেন না। যাত্রীরা চালকদের সন্দেহ করেন। তবে আমরা বলছি রাস্তায় পর্যাপ্ত পুলিশ নেই। নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। রাস্তায় বাস ছাড়াও মাইক্রো ও প্রাইভেট কারে ডাকাতি হচ্ছে। আমরা নিরাপত্তা চাই।’
এদিকে সোমবার রাজশাহী সফরে এসে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, ‘বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতিতে পৃথিবীর কোনো দেশেই শাসন কাজ চালানো খুব সহজ বিষয় নয়। এমনকি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পর দেশে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল? আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ আছে এমনটা নয়। কিছু বাস্তব সমস্যা আছে। আমরা কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করছি; বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন। তাদের দায়িত্বে সমালোচনা থাকতে পারে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ শুরু করেছি, এটা চ্যালেঞ্জ।’
একটি মহল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘টাকা থাকলে ও বদ মতলব থাকলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করা যায়। তাদের একটা রোল থাকতে পারে। স্বভাবগত অপরাধীদের ভূমিকা আছে, আমাদের ব্যর্থতাও আছে।’
একই দিন সকালে রাজশাহীর প্রাইমারি ট্রেনিং সেন্টারে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মানবাধিকার ও পরিবেশের ওপর গুরুত্বসহ আইন প্রয়োগ বিষয়ে কর্মশালায় যোগদানকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম।
তিনি বলেন, ‘একটি গোষ্ঠী চায় না বাংলাদেশে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় থাক। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বাভাবিক রাখতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং ডাকাতি-ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের তিনটি ইউনিট আজ থেকে কাজ শুরু করছে।’
‘রাজধানীতে রাতে ও দিনে ছিনতাই বেড়েছে। ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট র্যাব, এন্টি টেররিজম ইউনিট ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত ইন্টেনসিভ পেট্রোল প্রোগ্রাম আজ (সোমবার) থেকে কাজ শুরু করবে,’ যোগ করেন তিনি।
আইজিপি বলেন, ‘এতেও কাজ না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যৌথ বাহিনীতে একটা সাইজেবল কম্পোনেন্ট থাকে। আসলে পুলিশে এত বড় কম্পোনেন্ট নেই। কিন্তু যৌথ বাহিনী একটি জয়েন্ট পার্টি।’