প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১০:৫৭ এএম
আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২৪ ১২:১৯ পিএম
দুর্নীতি দমন কমিশন। ছবি : সংগৃহীত
দুর্নীতি দমন কমিশনের জালে ধরা পড়েছেন আরও পাঁচজন ভিআইপি। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, দুই সংসদ সদস্য ও একজন সিনিয়র সচিব। গত রবিবার তাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার করে পাহাড়সমান অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। দুদকের গোয়েন্দা শাখার প্রতিবেদন পাওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তারা হলেন, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাব্কে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ, বরগুনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভু, বরিশাল-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শাহে আলম তালুকদার ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব কবির বিন আনোয়ার।
দুদকের দৈনিক ও সাম্প্রতিক অভিযোগ সেলের পরিচালক উত্তম কুমার স্বাক্ষরিত চিঠি বিশেষ তদন্ত শাখার মহাপরিচালককে দেওয়া হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেবে দুদক।
গোলাম দস্তগীর গাজী
গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তিনি রূপগঞ্জের খাদুন এলাকায় গাজী টায়ার কারখানার ৮০ ভাগ জমি স্থানীয়দের কাছ থেকে জবর দখল করে নিয়েছেন। রূপসী এলাকার নূর মোহাম্মদ অভিযোগ করেন, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে এক বিঘা জমি লিখে দিতে বলেছিলেন গোলাম দস্তগীর গাজী। কিন্তু জমির প্রকৃত মূল্য ছিল ৩ কোটি টাকা। তিনি রাজি না হওয়ায় দখল করে নেন। গাজী রূপগঞ্জের কাঞ্চন, টেংরারটেক, পোনাব, শোনাব, আমলাব, আধুরিয়া, পূর্বগ্রামসহ আশপাশ এলাকায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ বিঘা জমি দখল করেছেন। রূপগঞ্জের পাশা গ্রুপের ১৩৯ শতাংশ জায়গার ওপর একটি পাঁচতলা স্টাফ কোয়ার্টার বানানো হয়েছে। কিন্তু গাজীর লোকজন এই কোয়ার্টারটি জোরপূর্বক দখল করে নেয়।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় গোলাম দস্তগীর গাজীর নগদ টাকা ও ব্যাংক আমানতের বাইরে অন্যান্য অস্থাবর সম্পদের যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তার আর্থিক মূল্য ৬৯৬ কোটি ৭ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫৩ টাকার বেশি।
ব্যবসা থেকে বছরে আয় ছিল ৩৪ কোটি ৭১ লাখ ৯ হাজার ৫৩৭ টাকা। এ ছাড়া বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, দোকান ভাড়া বাবদ হলফনামায় আয় দেখিয়েছেন ২ লাখ ৫৯ হাজার ২০০ টাকা। শেয়ার, সঞ্চয়পত্র এবং ব্যাংকের আমানত থেকে আয় ২ কোটি ৫১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৮ টাকা এবং সংসদ সদস্য হিসেবে সম্মানী ও বোর্ড মিটিং ফি বাবদ আয় ২৩ লাখ ৯২ হাজার ৭১৫ টাকা। আর ব্যাংকে তার একক ঋণ ৫৭৮ কোটি ৮৮ লাখ ২৬ হাজার ৯৬ টাকা।
দুদকের অভিযোগের শিরোনামে বলা হয়েছে, তিনি অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের অর্থ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচারসহ নিজ পরিবার সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।
শরীফ আহমেদ
ময়মনসিংহ-২ ফুলপুর তারাকান্দা আসনের সাবেক এমপি শরীফ আহমেদ ২০১৮ সালে হয়েছেন গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রী থাকাকালে তার সম্পদ বেড়েছে ৫৪ গুণ। জমাকৃত টাকা বেড়েছে পৌনে চার কোটি। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যহার, দুর্নীতি-অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে নিজ ও পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। দুদকে তার বিরুদ্ধে দুই পাতার অভিযোগে নানা অনিয়মের কথা বলা হয়। ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ও বাড়ি থাকার অভিযোগ রয়েছে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে। আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে টিআর ও কাবিখার অর্থ। রয়েছে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও রাজউকের প্লট জালিয়াতির অভিযোগ।
ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের ৩৩ বছর ধরে সভাপতি ও বরগুনা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের অন্ত নেই খোদ আওয়ামী লীগের নেতাদেরই। জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা এমপি শম্ভুর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ নেওয়া, রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিস্ফোরক মামলার আসামিকে অর্থের বিনিময়ে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা বানানো, মাইনাস টু ফর্মুলার সমর্থক হওয়া, আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের মূল্যায়ন না করা, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সংসদ সদস্য থাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তিনি।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। কাবিখা আর টিআরসহ ৪০ দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধ্যতামূলকভাবে মোট বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশ উৎকোচ দিতে হয় তাকে। তা ছাড়া জেলার সকল প্রকার মাদক কেনাবেচার নেতৃত্ব দিয়ে ইতোমধ্যে ‘মাদক সম্রাট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন এমপি শম্ভুর একমাত্র পুত্র সুনাম দেবনাথ। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তাকে ডিসি অফিসে ডেকে নিয়ে প্রহার করার অভিযোগও উঠেছে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বিরুদ্ধে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। রাজধানী ঢাকার গুলশানে এমপি শম্ভুর তিন হাজার তিনশ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা এবং প্রিয় প্রাঙ্গণে স্ত্রী-কন্যাসহ পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে চারটি প্লট। মধ্য বাড্ডা এলাকায় রয়েছে এক হাজার তিনশ বর্গফুটের দুটি ফ্ল্যাট। নিজের গাড়ি ছাড়াও তার স্ত্রী-কন্যাদের জন্যও রয়েছে চারটি বিলাসবহুল গাড়ি। বরগুনা মহাসড়ক এলাকায় এমপি শম্ভুর মাদকাসক্ত পুত্র সুনাম দেবনাথ এক একরেরও বেশি জমি কিনেছেন। বরগুনার তালতলী উপজেলায় ৪২ নম্বর মৌজার বড় নিশানবাড়ী ৪০৪ নম্বর খতিয়ানে ১৭ দশমিক ৫২ একর জমি রয়েছে তার। এ ছাড়া বরগুনা, আমতলী ও তালতলীতে নামে-বেনামে এমপি শম্ভুর রয়েছে শত কোটি টাকার জমি। ভারতের সল্টলেক এলাকায় রয়েছে তার নিজস্ব ভবন। সেখানে সুদীর্ঘ সময় ধরে নামে-বেনামে স্বর্ণ ব্যবসাসহ শত কোটি টাকার প্রতিষ্ঠান গড়েছেন তিনি। আমেরিকাতেও তার বিপুল ধনসম্পত্তি থাকার অভিযোগ রয়েছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে। গাজীপুরে তার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে।
শাহে আলম তালুকদার
বরিশাল-২ আসনের সাবেক এমপি শাহে আলম তালুকদার ছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। তার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে টিআর, কাবিখা, কাটিটার সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করে নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে ১২টি হিন্দু পরিবারের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। হিন্দুদের জমি দখলই যেন তার নেশা ছিল। খোদ শহীদ বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার স্বজনদের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে এই এমপির বিরুদ্ধে। তিনি স্কুলের নামেও জমি দখল করেন। বহু হিন্দু পরিবারকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করেন।
কবির বিন আনোয়ার
কবির বিন আনোয়ার পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব থাকাকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেন। তিনি নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেন। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কক্সবাজারের প্যাঁচার দ্বীপে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নজিরবিহীন প্রতারণা করেছেন। সাগরের উপকূল এলাকার ভাঙন রোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জরুরি কাজের আবেদন নিয়ে তিনি নিজের রিসোর্ট রক্ষা করেছেন। পাউবোর কক্সবাজারের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, স্থানীয় মানুষের আবেদনের পর পানি সম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ারের নির্দেশে রামু উপজেলার রেজু খালের মোহনা এবং প্যাঁচার দ্বীপে সাগরের উপকূল ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও টিউবের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জরুরি এই কাজের দৈর্ঘ্য ৩৩০ মিটার। ব্যয় হয়েছে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু কবির বিন আনোয়ার মানুষের স্বাক্ষর নিয়ে সেই বরাদ্দের অর্থ নিজের রিসোর্ট রক্ষায় ব্যয় করেন।
তার রিসোর্টের নাম ‘লাইট হাউজ’। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে ২০০০ সালের ৩০ নভেম্বর খুনীয়াপালং ইউনিয়নের প্যাঁচার দ্বীপ মৌজায় ২০ শতক জমি কেনেন মাত্র ৩০ হাজার টাকায়। এরপর সেখানেই তিনি রিসোর্ট বানিয়েছেন। দুদকের অভিযোগে বলা হয়, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সপ্তম ব্যাচের কর্মকর্তা কবির বিন আনোয়ারের ১৯৮৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সহকারী কমিশনার হিসেবে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে চাকরি জীবন শুরু। এরপর মাঠ প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন পদে থেকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালকও ছিলেন তিনি।
সবশেষ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হওয়ার আগে তিনি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সময় কবির বিন আনোয়ারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার প্রভাব খাটানো থেকে শুরু করে নানা বিতর্কিত কাণ্ড ঘটানোর অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে জনপ্রশাসনে তাকে নিয়ে আলোচনার অভাব ছিল না। তবে সরকার ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী আমলা হওয়ায় সে সময় তাকে নিয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পেত না। আড়ালে-আবডালেই চলত সমালোচনা। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে থাকাকালে তার পছন্দের ব্যক্তিরা ঠিকাদারি কাজ পেত বলেও অভিযোগ রয়েছে। তিনি এলাকায় যেতেন মোটরসাইকেল ও গাড়িবহরসহ। তার বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক তিনি।