আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ০০:৫৭ এএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪ ১০:৫৬ এএম
গরু-ছাগল বিক্রির নামে শুধু ক্রেতাদের সঙ্গেই প্রতারণা নয়, অন্য খামারিদের সঙ্গেও বাটপাড়িতে সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন বহুল আলোচিত সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক ইমরান হোসেন। কেউ কেউ আড়ালে তাকে ‘উচ্চ বংশীয়’ বাটপাড় বলেও সম্বোধন করে থাকেন। ঠিক যেভাবে তিনি গত কোরবানির ঈদের আগে তার খামারের আমদানি নিষিদ্ধ বিদেশি গরুগুলোর বংশ আভিজাত্য প্রচার করার মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলেন। খামারি পরিচয়ের আড়ালে প্রকৃতপক্ষে ইমরান হোসেন ছিলেন একজন পশু মাফিয়া। মিথ্যা বুলি আওড়িয়ে তিনি ক্রেতাদের ধোঁকা দিতেন। তবে তাকে সবচেয়ে বেশি অভিযোগের কাঠগড়ায় তুলেছেন সহযোগী খামারিরা। কথায় কথায় তিনি ওইসব খামারির ওপর হামলে পড়তেন, যারা তার বিরুদ্ধে কোনো বিষয় নিয়ে কখনও মুখ খুলতেন না। বাটপাড় শিরোমণি ইমরান হোসেনের হাতে নির্যাতনের শিকার বহু খামারি এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাতে বেরিয়ে আসছে ভয়াবহ সব কাহিনী।
জানা গেছে, জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আমদানি করা ব্রাহামা গরু জব্দের পর সেগুলোই আবার কৌশলে নিলামে তুলে নিজের কব্জায় নিয়েছেন ইমরান হোসেন। কিন্তু নিলামের অর্থ পরিশোধ না করেই ওইসব পশু বিক্রি করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। শুধু তা-ই নয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প থেকেও নগদ সহায়তা বাবদ হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অর্থ। সাদিক অ্যাগ্রোর একের পর এক প্রতারণা সামনে আসার পর গতকাল বুধবারও তাদের খামারে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ টিম। অভিযানে নেতৃত্বে থাকা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাদিক অ্যাগ্রো যেসব ব্রাহামা গরু নিলামে ক্রয় করে বিক্রির কথা বলছে, সেই গরুগুলো আমরা জীবিত পেয়েছি। ৬টি গরু জব্দ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের জিম্মায় রাখা হয়েছে।’
ইমরানের হাতে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হন বহু খামারি। তাদের একজন কাশফুল অ্যাগ্রোর মালিক শহীদুল ইসলাম সাঈদ। তিনি জানান, একসময় তিনি বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ২০১৮ সালে সিলেটের খামারিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অপরাধে ইমরান তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেন এবং নানাভাবে হয়রানি করেন। বিডিএফএফের গঠনতন্ত্র অনুসারে কারও খামার না থাকলে তিনি কার্যনির্বাহী কমিটিতে থাকতে পারবেন না। জাহিদ হোসেন নামে এক খামারি খামার বন্ধ করে দেওয়ায় তাকে দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় বাদ না দিয়ে সংগঠনের পিয়নের মাধ্যমে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বহিষ্কার করা হয়। এর প্রতিবাদ করায় ‘অসদাচরণের’ অভিযোগ তুলে সাঈদকে বহিষ্কার করা হয়। সাঈদ বলেন, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক শাহ এমরান ২০১৮ সালে খামার বন্ধ করে দেন। কিন্তু সাদিক অ্যাগ্রোর ইমরানের আজ্ঞাবহ হওয়ায় তিনি এখনও স্বপদে বহাল।
শহীদুল ইসলাম সাঈদ আরও বলেন, খামারিরা নিজস্ব প্রয়োজনে বিভিন্ন সোর্স থেকে কার্যকর ওষুধ, ভ্যাকসিন ও প্রিমিক্স সংগ্রহ করতে পারেন। আল-আমিন তালুকদার রুবেল নামে একজন খামারি নিজের খামারের জন্য ভারত থেকে ‘রক্ষা এফএমডি’ ভ্যাকসিন আনেন। ইমরান নিজেও রুবেলের কাছ থেকে ভ্যাকসিন নেন। তার সঙ্গে কিছুটা মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় রুবেলকে মধ্যরাতে বাসা থেকে পুলিশ দিয়ে তুলে নেওয়া হয়। থানায় প্রভাব খাটিয়ে দুই দিন তাকে আটক রাখা হয়। পরে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তার বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন চোরাচালানের অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়। গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, চোরাই ভ্যাকসিনসহ চেকপোস্টে রুবেলকে আটক করেছে পুলিশ। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অনেক অপপ্রচার চালান ইমরান ও তার আজ্ঞাবহরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মামলার বাদী হলেও ইমরান নিজে অর্থ ব্যয় করে আইনজীবী নিয়োগ করেন। ওই মামলায় রুবেলকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ১৭ দিন কারাভোগের পর রুবেল জামিনে বেরিয়ে আসেন।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, সাদিক অ্যাগ্রোর ইমরান তার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতো আলাদা একটি সংগঠন করায় ১৬ খামারির বিরুদ্ধে মামলা দেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মধ্যরাতে খামারিদের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। বাড্ডার খামারি আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাঈদের যাত্রাবাড়ীর বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে না পেয়ে তার এক আত্মীয়কে তুলে নেওয়া হয়। একই মামলার আসামি বগুড়ার তৌহিদ পারভেজ বিপ্লব নানা চাপে ইমরানের কাছে বশ্যতা স্বীকার করায় তাকে বিভিন্ন মেলা, অনুষ্ঠানে সঙ্গে নেওয়া হয়। বিষয়টিতে অন্য খামারিরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
সাঈদ আরও বলেন, খামারিদের একটি ফেসবুক গ্রুপ ছিল বিডিজিএইচ। গ্রুপে সাদিক অ্যাগ্রোকে নিয়ে নেগেটিভ মন্তব্য অ্যাপ্রুভ করায় গ্রুপের অ্যাডমিন জেবরুলকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়। ওই সময় সদ্যবিবাহিত জেবরুলকে ছাড়ানোর জন্য তার মা ও খালা সারা রাত ইমরানের বাসার সামনের রাস্তায় বসে ছিলেন। কিন্তু ইমরান কোনো সহযোগিতা করেননি। বরং বুক ফুলিয়ে বলেন, ‘আমার তৈরি ব্ল্যাক হোলে পড়ে গেছে। আমার মতের বিরুদ্ধে কেউ গেলে তাকেও জেবরুলের পরিণতি ভোগ করতে হবে।’ এছাড়া রাসেল নামে এক খামারিকে প্রকাশ্যে মারধরের অভিযোগ করেছেন সাঈদ। তিনি বলেন, ইমরানের পক্ষ নিয়ে কেউ কেউ খামারিদের এক হওয়ার ডাক দিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে ইমরান জোরজুলুম করে ডেইরি খাতের অধিপতি হতে চেয়েছেন। তাই তার বিপদে কেউ এগিয়ে আসছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন খামারি বলেন, ইমরানকে কখনোই খামারি মনে হয়নি। তিনি গবাদিপশু বিক্রির আড়ালে একটি সিন্ডিকেট ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলেছেন। খাল দখল করে খামার করেছেন। পুলিশ ও সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সহযোগিতা পাওয়ার ফলে ইমরান ছিলেন বেপরোয়া।
পরিশোধ করেননি ব্রাহামার দাম
কোরবানির ঈদে কোটি টাকা দামের গরু ও ১৫ লাখের ছাগল বিক্রিসহ সাদিক অ্যাগ্রোর ইমরানের নানামুখী প্রতারণা ও মিথ্যাচারের তথ্য প্রকাশ হয় দেশের গণমাধ্যমে। ওইসব প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সাভারের ভাকুর্তা ইউনিয়নে সাদিক অ্যাগ্রোর খামারে অভিযান চালায় দুদক। এ সময় দুদকের কর্মকর্তারা ওই খামারে আমদানি ও বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদন নিষিদ্ধ সাতটি ব্রাহামা জাতের গরুর বাছুর ও পাঁচটি গাভির সন্ধান পায়। তার আগে দুদকের টিম সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে অভিযান পরিচালনা করে। সেখান থেকে গত রমজানে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমরানকে দেওয়া ১৫টি ব্রাহামা জাতের গরুর নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়। ওই নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ইমরান ব্রাহামা জাতের গরুগুলো নিলেও সেগুলোর মূল্য পরিশোধ করেননি। তাছাড়া গরুগুলো রমজান মাসে জবাই করে দুস্থদের মাঝে বিক্রি করার কথা থাকলেও সেটা করেননি।
অভিযানে অংশ নেওয়া দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইমরান সবগুলো বিষয় নিয়ে বাটপারি করেছেন। দুস্থদের কাছে গরু বিক্রির কথা থাকলেও তিনি সেটা করেননি। তিনি এতিম-দুস্থদেরও হক মেরে খেয়েছেন।’
মোহাম্মদপুরে সাদিক অ্যাগ্রোতে ফের অভিযান
এদিকে দুদক গতকাল বুধবারও মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় সাদিক অ্যাগ্রোর খামারে অভিযান চালায়। অভিযানে নেতৃত্বে থাকা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাদিক অ্যাগ্রো যেসব গরু রোজার সময় কম দামে বিক্রির কথা বলে নিলামে ক্রয় করে, সেগুলো আমরা জীবিত পেয়েছি। তাদের কাছ থেকে গরু ও বেশকিছু নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। নথিগুলো পর্যালোচনা করে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
সরকারি প্রকল্প থেকে পেতেন প্রণোদনা
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে। এই প্রকল্প থেকে খামারিদের নগদ সহায়তা দেওয়া হয়। নানা কৌশলে এই প্রকল্প থেকেও অর্থ হাতিয়ে নেন ইমরান। ডেইরি খাতে ২-৫টি গরু, ৬-৯টি গরু ও ১০-২০টি গরুÑ তিন ক্যাটাগরিতে নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয় তাকে। কয়েক বছর ধরে ইমরান এই খাত থেকে অর্থ সহায়তা নিয়েছেন। তিনি কত প্রণোদনা পেয়েছেন তার সঠিক হিসাব দিতে পারেননি প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা।
জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, ‘ইমরান ম্যাচিং ব্র্যান্ড ও বায়োগ্যাস প্লান্টের জন্য কিছু নগদ অর্থ সহায়তা নিয়েছেন। তবে সেটা সাদিক অ্যাগ্রোর নামে নয়, নিয়েছেন জেনিথ নামে।’
প্রসঙ্গত, গত কোরবানির ঈদে সাদিক অ্যাগ্রোতে ‘বংশীয় গরু, খানদানি ছাগল, গরুর বংশ পরিচয় আছে, গরুর ১১০ বছরের ব্লাডলাইন আছে’ ইত্যাদি মিথ্যাচার করেন ইমরান হোসেন। প্রাণিসম্পদ মেলায়ও তিনি গরুর বংশ পরিচয় নিয়ে কথা বলে ভাইরাল হন। ঈদের সময় তিনি বলেন, ‘গরুর দাম এক থেকে দেড় কোটি, কারণ এই গরুর ১১০ বছরের পেডেগ্রি আছে। গরুর বাপ, দাদা এবং পরদাদারা ছিল ব্লাডলাইন চ্যাম্পিয়নের নোবেল সিরিজের গরু। এই গরুর দাঁড়ানোর স্টাইলও ভিন্ন! যার ফলে এটার দাম এক থেকে দেড় কোটি টাকা।’ তার খামার থেকে ১৫ লাখ টাকার ছাগল কেনেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাত। সমালোচনার একপর্যায়ে মতিউর তার ছেলেকেই অস্বীকার করেন। ঘটনা নাটকীয় মোড় নেয়। গণমাধ্যমে আসতে থাকে মতিউর পরিবারের শতকোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কাহিনী। পরে তাকে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্টের পদ ও সোনালী ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছে দুদক।