× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কোটি টাকায় নিষিদ্ধ ব্রাহামার ক্রেতা ‘সাকের ভাই’ কে

আলাউদ্দিন আরিফ

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ০৮:৫২ এএম

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৪ ১১:২৪ এএম

কোটি টাকার ব্রাহামা গরু ক্রয়ের পর বিক্রেতার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন সাকের আহম্মেদের শ্যালক। ছবি : সংগৃহীত

কোটি টাকার ব্রাহামা গরু ক্রয়ের পর বিক্রেতার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছেন সাকের আহম্মেদের শ্যালক। ছবি : সংগৃহীত

বহুল আলোচিত সাদিক অ্যাগ্রো থেকে কোটি টাকা দিয়ে আমদানি নিষিদ্ধ ও অবৈধ ব্রাহামা জাতের গরুটি কে কিনেছেন, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ইমরান হোসেন একটি ভিডিওতে বলেছিলেন, ‘সাদিক অ্যাগ্রো থেকে বাংলাদেশের ওয়ান অ্যান্ড অনলি আমেরিকান পাখারা ব্রাহমন (ব্রাহামা), হাইড সুপার ডুপার বিক্রি হলো, ক্রেতা আমাদের বিলাভ-অ্যাট সাকের ভাই।’ এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই প্রশ্নও ছড়িয়ে পড়েছে- কে এই সাকের ভাই? কীভাবে তিনি কোটি টাকায় নিষিদ্ধ ব্রাহামা জাতের গরু কেনার মতো সামর্থ্যবান হয়ে উঠলেন?  

প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত এই সাকের ভাইয়ের পুরোনো নাম সাকের আহম্মেদ। তিনি তৈরি পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ইসলাম গ্রুপ।’ এই প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকটি ইউনিট রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী সাকের আহম্মেদকে সিআইপি (বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি) কার্ড দেওয়া হয়। একটি সূত্রমতে, তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের ভাইয়ের ছেলে (ভাতিজা)।

ইসলাম গ্রুপের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, ইসলাম গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) হিসেবে সাকের আহম্মেদের নাম রয়েছে। তাদের কার্যালয় গুলশানের অ্যাভিনিউর র‌্যাংগস অর্কিড ভবনে। ফ্যাক্টরির ঠিকানায় উল্লেখ করা হয়েছে গাজীপুরের কোনাবাড়ির জারুন এলাকার নাম। গাজীপুরের কাপাসিয়া ও কোনাবাড়িসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাকেরের রয়েছে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি। বিভিন্নজনের জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিভিন্ন ভিডিওতে যেমন দেখা গেছে 

প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে আসা একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, ইমরান নিজেই বলছেন, ‘সাকের ভাই এবার হজ পালন করতে যাচ্ছেন। সবাই সাকের ভাইয়ের হজ কবুল হওয়ার দোয়া করবেন। অল দ্য বেস্ট সাকের ভাই। আমিন, ছুম্মা আমিন।’ ভিডিওর একটি অংশে গরু কেনার পর ক্রেতার সঙ্গে বিক্রেতা ইমরান হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করছেন, এমন দৃশ্যও রয়েছে। তবে গতকাল মঙ্গলবার ইসলাম গ্রুপের গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে খোঁজ করলে জানানো হয়, সাকের আহম্মেদ অফিসে নেই। তিনি কবে অফিসে আসবেন সেটাও উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জানা নেই। 

ভাতিজা সাকের আহম্মেদের কোটি টাকায় ব্রাহামা গরু ক্রয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সাদিক অ্যাগ্রোর অপর একটি ভিডিও থেকে জানা যায়, সাকের আহম্মেদ ব্রাহামা জাতের দুটা গরু কিনেছেন। প্রতিষ্ঠানটি গরু দুটির নাম দিয়েছে ‘পিয়েল’ ও ‘কমান্ডো’। ভিডিওতে ইমরান বলছেন, ‘দুটি দুম্বা বাসায় পাঠিয়ে দিব ভাই।’ ভিডিওটিতে ব্রাহামা গরু পিয়েল ও কমান্ডোর সঙ্গে সাকেরের একাধিক আত্মীয়কেও দেখা যায়।

উল্লেখ্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউটিউবার ও ব্লগারদের দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করে আলোচনায় থাকা এবং পশুর দাম বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াই টার্গেট ইমরানের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দামি গরুতে মুনাফা করার মধ্য আমি খারাপ বা প্রতারণার কিছু দেখি না।’

গরু ও ছাগল কোনোটিরই ডেলিভারি হয়নি

কোটি টাকার গরুটিকে কোরবানি দেওয়া হয়েছে কোথায়? এ সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, বিক্রি হলেও সেটি এখনও ডেলিভারিই দেওয়া হয়নি। এ সম্পর্কে সাদিক অ্যাগ্রোর ইমরান হোসেন বলছেন, ‘যে ব্যক্তি কোটি টাকায় গরুটি কিনেছেন, তিনি এ বছর হজে গিয়েছেন; তাই গরু ডেলিভারি নেবেন আগামী বছর।’ 

শুধু গরু নয়, সেই আলোচিত ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগলও রয়ে গেছে সাদিক অ্যাগ্রোর খামারেই। উল্লেখ্য, এই ‘ব্রিটল’ জাতের ছাগল আমদানি, উৎপাদন এবং বিক্রয়ও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। 

এখনও খামারে রয়েছে অবিক্রীত গরু

এখনও ইমরানের কাছে রয়েছে ‘টেক্সাসের সুলতান’সহ কয়েকটি ব্রাহামা গরু। জেডি হাজিন্স ব্রিডের গরুটিও এখনও বিক্রির চেষ্টা করছেন তিনি। ব্রাহামা জাতের গরু বাংলাদেশে আমদানি ও উৎপাদন নিষিদ্ধ হলেও ২০২১ সালে জালজালিয়াতির মাধ্যমে কয়েকটিকে দেশে নিয়ে আসে সাদিক অ্যাগ্রো। গরুগুলো জব্দ করে টানা তিন বছর প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট একজন মন্ত্রীসহ কয়েকজনের ইচ্ছায় গরুগুলোকে কথিত নিলামে তোলা হয়। চলতি বছরের শুরুতে আয়োজিত এই কথিত ‘নিলামে’ গরুগুলো কিনে নেয় সাদিক অ্যাগ্রো। রমজান মাসে এগুলোকে জবাই করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রির কথা ছিল কিন্তু তা করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন খামারি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাদিক অ্যাগ্রোর ইমরান একজন বড় মাপের প্রতারক। তিনি দাবি করছেন, তিনি বৈধ নিলামে ব্রাহামা গরুগুলো নিয়েছেন। তাহলে তিনি সেই ‘অকশন শিট’ দেখান। আসলে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কয়েক কর্মকর্তার যোগসাজশে তিনি গরুগুলো হাতিয়ে নিয়েছেন। ‘আয়নাবাজির’ মতো গাবতলী হাট থেকে কয়েকটি গরু কিনে সেগুলো কেটে বিক্রি করেছেন। অন্যদিকে ব্রাহামা গরুগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। এখন ওইসব নিষিদ্ধ গরু কোটি টাকা দামে বিক্রি করছেন।’

পশু চোরাচালানেও জড়িত সাদিক অ্যাগ্রো 

সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে সাদিক অ্যাগ্রো শুধু আমদানি নিষিদ্ধ গরু-ছাগলই বিক্রি করছে না; অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি গবাদিপশু চোরাচালানেও জড়িত। তারা ভারত, চীন ও মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে শত শত গরু নিয়ে আসে। এসব গরু ‘বংশীয়, মা-বাবার বংশ ভালো, খানদানিÑ এ ধরনের নানা মিথ্যাচার চালিয়ে বিক্রি করেন ইমরান।

সাদিক অ্যাগ্রোর সঙ্গে পুলিশসহ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও রয়েছে বিশেষ খাতির। কয়েকদিন আগে তিনি ‍গুলশান থানার এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করেন। পরে দাপট খাটিয়ে কর্মকর্তাটিকে অন্যখানে বদলিও করেন। গুলশান এলাকায় ‘সাদিক অ্যাগ্রো’ নামে একটি রেস্টুরেন্টও রয়েছে। তিনি পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মাধ্যমে সরকারি জমিটি ভাড়া নিয়ে রেস্টুরেন্ট বসিয়েছেন। 

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, ‘বাংলাদেশে আমদানি নিষিদ্ধ জাতের গবাদিপশু আমদানি বা পোষার অনুমতি কোনো খামারিকে দেওয়া হয়নি।’ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন বিভাগের পরিচালক ডা. আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, ‘আমাদের দেশে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন আইন-স্বীকৃত। এছাড়া যেসব চটকদার নামসংবলিত ছাগলের কথা বলছেন, সেগুলো আমাদের প্রাণিসম্পদ নীতিমালা ২০০৭ অনুযায়ী অনুমোদিত নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্রাহামা পালন, এর সিমেন্স উৎপাদন বা সংরক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়নি।’

সাদিক অ্যাগ্রোর নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক বলেন, ‘ব্রাহামাসহ নিষিদ্ধ জাতের গবাদিপশু পালনকারীদের আমরা নিরুৎসাহিত করি। এ ব্যাপারে খামারিদের সতর্ক থাকা উচিত। সাদিক অ্যাগ্রোসহ যেসব খামারি আমদানি নিষিদ্ধ গবাদিপশু রাখবেন, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা নেব।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা