বগুড়া অফিস
প্রকাশ : ০৯ মে ২০২৪ ২২:২৬ পিএম
বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ে বসেছে সাধু-সন্ন্যাসী ও পুণ্যার্থীদের মিলনমেলা। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার জমে এই মেলা। প্রতি বছরের মতো এবারও মহাস্থানগড় হজরত শাহ সুলতান বলখীর (র.) মাজার এলাকায় সাধু-সন্ন্যাসী আর পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে মেলায়। বাউলদের জারি-সারি আর মারফতি গানে মুখরিত হয়ে উঠেছে এবারের উৎসব।
বৃহস্পতিবার (৯ মে) মেলা হলেও কয়েকদিন আগে থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারও নারী-পুরুষ, বাউল, বৈরাগী, আর সাধু-সন্নাসীরা আস্তানা গাড়েন মেলায়। নানা তরিকার নানা ধর্মের ‘সংসার ত্যাগীদের’ মহাসম্মেলনে রূপ নেওয়া এই উৎসবে কেউ আসেন নাচতে, কেউ গাইতে, কেউ আসেন জিকির-আজকার করতে। সব মিলিয়ে মেলার বিচিত্র কর্মকাণ্ড দেখতে দেশের নানা প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসেন হাজারো উৎসুক মানুষ।
কথিত আছে, পুণ্ড্রনগরের অত্যাচারী রাজা পরশুরামকে পরাজিত করে সুফী সাধক হযরত শাহ সুলতান মাহিসওয়ার বলখী (রঃ) মহাস্থানগড় বিজয় করেন। এদিকে নিজের সম্ভ্রম ও ধর্ম রক্ষার জন্য পরশুরামের একমাত্র বোন শিলা দেবী করতোয়া নদীতে প্রাণ বিসর্জন দেন। তবে অনেকের ধারণা, বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার শাহ সুলতান মাহিসওয়ার বলখী (র:) মৃত্যুবরণ করেন। সেই থেকেই প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার মানুষ মহাস্থানে সমবেত হন।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতি বছরের মতো এবারও মাজারের আশপাশের এলাকায় সাধু-সন্ন্যাসী আর পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। মেলাজুড়ে বিভিন্ন স্থানে সামিয়ানা টানিয়ে মারফতি গানের আসর জমিয়েছেন বাউল-সাধকরা। কেউ কেউ নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন ও মনোবাসনা পূরণের আশায় মাজারের পশ্চিম পাশে পাথরে দুধ ঢালছেন, কেউবা আবার সেখান থেকে দুধ নিয়ে পান করছেন। এছাড়াও মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে বসেছে বাহারি পণ্যের দোকান। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কেনাকাটা করছেন। কিছু না কিনলেও মহাস্থানের ঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত কটকটি কিনতে যেন ভুলছেন না কেউ। সবকিছু মিলিয়ে ঢাকঢোলের বাজনায় মুখর প্রাচীন বাংলার রাজধানী পুণ্ড্রনগর।
সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থেকে মেলায় আসা জুরান সাধু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতি বছরই আমি এই মেলায় আসি। মূলত সুলতান বাবার টানেই এই মেলায় আসা হয়।’
কুড়িগ্রামের বেলাল পাগলা বলেন, ‘প্রতি বছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। শাহ সুলতানের মাজার জিয়ারত করার জন্য আসি। এখানে আসলে মন ভাল হয়ে যায়।’
রুহুল আমিন নামে এক সাধু বলেন, ‘কুষ্টিয়া থেকে এসেছি। ভক্তদের দেখে মনে প্রশান্তি লাগে। রাতভর ইবাদত করব। কাল নামাজ পড়ে চলে যাব।’
এদিকে মেলা উপলক্ষ্যে মাজার এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কটকটি বিক্রির দোকানগুলোতে ভিড় ছিল চোখে পরার মতো।
নাসির কটকটি ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. রঞ্জু ইসলাম বলেন, ‘মেলা উপলক্ষে প্রচুর বেচাবিক্রি হচ্ছে। গত বছর ৯০ মণ বিক্রি করেছি। এবার এর থেকে বেশি হবে আশা করি। মাজারের আশপাশে অন্তত ২০০ কটকটির দোকান রয়েছে। এসব দোকানে প্রতি বছর কোটি টাকার বেশি কটকটি বিক্রি হয়।’
মহাস্থানগড় মাজার মসজিদের খতিব মওলানা ইমদাদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতি বছরের বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। তারা এখানে পুণ্য লাভের আশায় মাজার জিয়ারত, ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ এবং দোয়া-প্রার্থনা করেন।’
মাজার কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহেদুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বছর এখানে লাখো ভক্ত ও সাধু-সন্যাসীসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমাগম ঘটে। এবার আমাদের প্রায় ৪০০ স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মেডিকেল টিমও রাখা হয়েছে। রাতব্যাপী আমবয়ান হয়। এখানে রাতভর ইবাদত করেন তারা। শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর এই মেলার আয়োজন শেষ হয়।’
মেলাজুড়ে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রউফ প্রতিদিনের বাংলাদেশেক বলেন, ‘মেলাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আড়াইশ সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য আমরা সতর্ক রয়েছি।’