খানসামা (দিনাজপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১৭:৩৫ পিএম
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১৮:০৫ পিএম
করুনা কান্ত সেনের রসুন খেত। ২৩ জানুয়ারি দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার সহজপুর গ্রামে। প্রবা ফটো
কয়েক সপ্তাহের তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় স্থবির হয়ে পড়েছে সারা দেশ। কোনো কোনো অঞ্চলে টানা কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। প্রতিকূল এ আহ্বাওয়ায় সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত রসুন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দিনাজপুরের খনসামা উপজেলায় চাষীরা।
দিনাজপুরের খনসামা উপজেলায় চলতি মৌসুমে আগেরবারের চেয়ে বেশি রসুন চাষ করা হয়েছে। ভালো ফলনের আশায় ছিলেন কৃষকরা। কিন্তু রসুন গাছের পাতায় রোগ দেখা দিয়েছে। হলুদ হয়ে পড়ছে রসুন গাছের পাতা। কীটনাশক স্প্রে করেও মিলছে না সুফল। এতে করে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, বৈরী আহ্বাওয়ার কারণেই এমনটি হচ্ছে। এটি টিপবার্ন রোগ। এটা নিয়ে দুশ্চিন্তার তেমন কোনো কারণ নেই। তবে চলতি খারাপ আহ্বাওয়ায় নিতে হবে বাড়তি যত্ন।
বাড়তি যত্ন বলতে কীটনাশকের ঘনত্ব বাড়িয়ে স্প্রে করতে হবে। কুয়াশা থাকায় সেচ বন্ধ রাখতে হবে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের আশা, বাড়তি যত্ন নিলে শৈত্যপ্রবাহ কেটে গেলে রসুন গাছের এ সমস্যা কেটে যাবে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ৬টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে রসুন চাষ হয়েছে। গত বছর তা ছিল ১ হাজার ৫০০ হেক্টর।
দিনাজপুর আঞ্চলিক আহ্বাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সোমবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে আদ্রতা ছিল ৯০%। সকাল ৯ টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ১ ডিগ্রি। আদ্রতা ৮৮%।
আঞ্চলিক আহ্বাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস, দিনাজপুর আঞ্চলে জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত শীতের তীব্রতা থাকতে পারে। দমকা হাওয়া বা বৃষ্টি না হলে ঘন কুয়াশা সরবে না। আর কুয়াশা না সরলে রোদ এসে শীতের দাপট কমাতে পারবে না।
সোমবার সকালে উপজেলার গোয়ালডিহি, হাসিমপুর, কাচিনীয়া, গুলিয়ারা ও বালাপাড়া গ্রামে রসুন চাষকারীদের সঙ্গে কথা হয়েছে। কৃষকদের কণ্ঠে ছিল উদ্বেগের সুর।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে রসুন চাষে বীজ, সার, সেচ, হাল ও পরিচর্যা বাবদ চলতি মৌসুমে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এবার বীজের দাম বেশি হওয়ায় খরচটা বেড়ে গেছে।
বিঘা প্রতি ফলন হয় ৪৫ থেকে ৬০ মণ। বর্তমানে প্রতি মণের বাজার মূল্য ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। তাই খরচ বেশি হওয়ার পরও চলতি মৌসুমে ভালো লাভের আশা করছেন কৃষকরা। কিন্তু গাছের পাতার রং হলুদ হয়ে যাওয়ায় তারা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
গোয়ালডিহি জমির শাহ পাড়া এলাকার রসুনচাষি রিশাদ শাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, রসুন গাছের পাতার রং এমন পরিবর্তন হচ্ছে দূর থেকে দেখলে মনে হয় সরিষার খেত। কীটনাশক ও স্প্রে ব্যবসায়ীদের পরামর্শে পরিচর্যা করেও অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। এক বিঘা জমিতে রসুন চাষ করছি। এমনিতেই বীজ ও সার-কীটনাশকে খরচ হচ্ছে। আবার এ সমস্যায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি।
খামারপাড়া ইউনিয়নের কৃষক মাহফুজ আলম বলেন, এ বছর দেড় বিঘা জমিতে রসুন আবাদ করেছি। সবকিছু ভালোই আছে। তবে রসুনে গাছের মাথায় হলুদ হওয়ার কারণে একটু চিন্তায় পড়েছি।
চলতি মৌসুমে শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশাময় দিন প্রলম্বিত হওয়ায় প্রায় সব ধরনের ফসল চাষীরা কিছুটা সমস্যার মধ্যে পড়েছেন। কারণ শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে বীজতলায় সমস্যা দেখা দিয়েছে। সরিষা দানা বাঁধতে সমস্যা হয়েছে। রসুনের পাশাপামি ভুট্টা খেত হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে।
উপজেলার হোসেনপুর গ্রামের কৃষক আবেদ আলী বলেন, ৬ বিঘা জমিতে সরিষা, ৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা লাগিয়েছি। ৬ বিঘা জমিতে ইরি-ব্রো রোপন করার জন্য বীজতলা বপন করেছি। কুয়াশায় ধানের চারা হলুদ হয়ে যাচ্ছে। তীব্র শীতে সরিষা দানা বাঁধতে পারছে না। বীজতলাতে রাতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখছি। শীত ও কুয়াশা আরও বাড়লে বীজতলা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিরাজমান সমস্যায় কৃষকদের পাশে রয়েছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। খামারপাড়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শ ম জাহিদুল ইসলাম বলেন, কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সব সময় খেত পরিদর্শন করছি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। আশা করি কৃষকেরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে না।
খানসামা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসার হাবিবা আক্তার বলেন, শৈত্যপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মাঠের ফসল রক্ষায় এরই মধ্যে কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছি। আর রসুনে তীব্র শীতের কারণে টিপবার্ন রোগটা বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি হলে এই অবস্থার উন্নতি হবে। কৃষকদের সচেতনতার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তাই আতঙ্কিত না হয়ে যেকোনো প্রয়োজনে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।