× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘একখান কম্বলের জন্য’ সারা রাতের অপেক্ষা

শাহ্ আলম শাহী, দিনাজপুর

প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ১০:০০ এএম

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ ১০:৪৮ এএম

দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে একটি কম্বলের জন্য অপেক্ষায় কয়েকজন নারী। শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় তোলা। প্রবা ফটো

দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে একটি কম্বলের জন্য অপেক্ষায় কয়েকজন নারী। শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় তোলা। প্রবা ফটো

‘একখান কম্বলের ব্যবস্থা করি দেইস বা, হাত-পা ককড়া লাগি আইসেছে। বরফ হই গেইছে গাওটা। একখান কম্বলের জন্যই অপেক্ষায় আছো বা। কম্বল পাইলেই বাড়ি চলি যাম’, গত শনিবার রাত সাড়ে ১২টায় দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশন চত্বরে একটি কম্বলের জন্য এমন আকুতি করছিলেন কোহিনুর বেগম। ষাটোর্ধ্ব কোহিনুরের বাড়ি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার আমবাড়ী এলাকায়। গত দুদিন ধরে একটি কম্বলের আশায় তিনি রেলস্টেশন এলাকায় অপেক্ষমাণ। স্বামী নেই তার, মারা গেছেন অনেক আগেই। এক ছেলে থাকলেও কোনো খবর নেই তার। এক মেয়ে আছে, বিয়ের পর স্বামী ছেড়ে গেছে। মেয়ের দুই সন্তানসহ তারা তিনজন এখন কোহিনুরের সঙ্গে থাকে। কোহিনুরের দেড় বছরের ছোট্ট নাতনির জন্য তার একটা কম্বল দরকার। শুনেছেন, রেলস্টেশনে রাতে অনেকে কম্বল দেয়। সেই আশায় তিনিও এসেছেন ২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে। দুদিন ধরে অপেক্ষায় আছেন কেউ যদি একটা কম্বল দেয়- এই আশায়। যাত্রীদের কাছে চেয়ে-চিন্তে যা পেয়েছেন, তা দিয়ে শাক আর রুটি কিনে খেয়েছেন। 

স্টেশন চত্বরে শুধু কোহিনুর বেগমই নয়; মোসলেমা, রমিছা, মাজেদা, সোহানা, বিলকিস, রোজিনা, আকলিমা, রাবেয়া, পারুল, ফাতেমা, মজিদ, মোকসেদ, রমজান, সতেন্দ্র, মকবুল, মমিনুল, আবুল কালাম, সিদ্দিক, ফজলা, কমলাকান্ত, আসাদুল্লাহসহ অনেককেই একটি কম্বলের জন্য অনেক রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। 

তাদের দুয়েকজনের সঙ্গে কথা বলতে গেলে বেশ কয়েকজন বয়স্ক নারী-পুরুষ ঘিরে ধরে। তাদের ধারণা, কম্বল দেওয়ার জন্য হয়তো তালিকা করতে এসেছে কেউ! এ সময় এক নারী বললেন, ‘বাবা রে, হামাকেও একখান কম্বল দেন, বাবা। তোমার পাওখান ধরি, হামাক একখানা কম্বল দেন। কত কষ্ট করিয়া এই স্টেশনে পরি আছি। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ থাকি আইছু বাপ। একখান কম্বল কেহ দিলে না। জাড়োত কাঁপেছো। বুড়া মানুষ হয়াও হামার দেকি (দিকে) কেউ দেখেও না। হামাক একখান কম্বল দাও বা!’

একটি কম্বলের জন্য তিনি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দিনাজপুর রেলস্টেশনে অবস্থান করছেন। ষাটোর্ধ্ব এই নারীর নাম মোসলেমা বেওয়া। এ বছর একটিও ভালো কম্বল পাননি তিনি। বিগত বছর যেগুলো পেয়েছেন, সেগুলোর মান একদম ভালো না, নষ্ট হয়ে গেছে; এমনটাই জানালেন তিনি।

রাহেলা খাতুনের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। জানালেন, তিনিও একটি ভালো কম্বল নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছেন এখানে। রাহেলা ভাড়া থাকেন শহরের উপকণ্ঠ হঠাৎপাড়ায়। তিনি বলেন, ‘স্টেশনে থেকে এ পর্যন্ত দুটি কম্বল পেয়েছি। কিন্তু কোনোটাই ভালো নয়। যেগুলো পেয়েছি অনেক হালকা। ওই কম্বল দিয়ে শীত নিবারণ করা সম্ভব নয়।’

মজিবর রহমানের বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই, বাড়ি রংপুরের পীরগাছায়। তিনি জানান, একটি ছেলে রয়েছে তার। তবে সেই ছেলে মা-বাবাকে দেখাশোনা করে না। বিয়ে করে পৃথক থাকে। মানুষের কাছে হাত পেতে যা পান, তা-ই দিয়ে চলেন। তিনিও আছেন একটা কম্বলের আশায়। কম্বল পেলেই বাড়ি যাবেন। এই ঠান্ডায় কম্বল ছাড়া বাড়ি যাওয়া যাবে না বলেও জানান তিনি।

শুধু যারা চেয়ে বা ভিক্ষাবৃত্তি করে চলেন তারাই শুধু নয়, রাতের অন্ধকারে রেলস্টেশনে অনেকেই আসেন একটি ভালো কম্বলের আশায়। এদের অধিকাংশেরই বাস বস্তি এলাকায়। এমনি একজন কুলসুমা বেগম। তিনি জানালেন, ‘শুধু আমি না, অনেকেই আসি বসি থাকে। রাইত পার করি দেয়, একখান কম্বলের জন্যে। কিন্তু যেসব কম্বল দেয়, সেগুলো নেওয়ার মতো না।’

মখলেসুরের বয়স প্রায় ৫০ বছর। অপেক্ষায় আছেন তিনিও। বলেন, ‘শুধু আমিই না, দিনাজপুর শহরে যারা বস্তিতে বসবাস করে, তারাই রাতের আঁধারে স্টেশনে এসে বসে থাকে একটি ভালো কম্বলের জন্য।’

এক সপ্তাহ ধরেই হাড় কাঁপানো কনকনে শীত আর হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত উত্তরের জনপদ দিনাজপুর। প্রতিদিনই বাড়ছে শীতের প্রকোপ। গতকাল রবিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল দিনাজপুরে, ৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ জেলায় চলতি মৌসুমের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। 

গত চার দিন শীতের প্রকোপে দিনাজপুর জেলার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে স্টেশন চত্বরে কম্বলের জন্য অপেক্ষমাণদের মতো বস্তিবাসী, নিম্ন আয় ও শ্রমজীবীদের অবস্থা বেশি শোচনীয়। শীত নিবারণে যাদের যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই, তারাও উষ্ণতার আশায় খড়কুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে শরীর গরম করে নিচ্ছে। দিনভর কনকনে ঠান্ডা বাতাসে জীবন বিপন্ন করে তুলছে পথে-প্রান্তরে থাকা ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র মানুষগুলোর। 

শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে নিম্ন আয়ের মানুষ ভিড় করছে পুরোনো শীতবস্ত্রের দোকানগুলোয়। আর সামর্থ্যবানরা যাচ্ছেন অভিজাত শপিংমল কিংবা মার্কেটে। 

দিনাজপুরে এত বেশি ঠান্ডা অনুভূত হওয়ার কারণ হিসেবে জেলার আঞ্চলিক আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জেলার ওপর দিয়ে মৃদু শৈত বয়ে যাচ্ছে। হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যেই ১৮ বা ১৯ জানুয়ারি বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। চলমান শীতের তীব্রতা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।

দিনাজপুরের ছিন্নমূল, নিম্ন আয়ের মানুষদের শীতবস্ত্র সহায়তায় সরকারি উদ্যোগ প্রসঙ্গে কথা হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) দেবাশীষ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জেলায় শীতের প্রকোপ বেড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা কষ্টে আছে। শীতার্তদের জন্য ইতোমধ্যে ২০ হাজার পিস কম্বল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে জরুরি বার্তা পাঠানো হয়েছে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা