মৌলভীবাজার প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:২৪ পিএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:৪৮ পিএম
মেলায় বিক্রয় করার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে ১২০ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছ। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের শেরপুর উপজেলায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় ‘পৌষ সংক্রান্তি’ বা ‘মকর সংক্রান্তি’ উপলক্ষে দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা শুরু হয়েছে।
শনিবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার কুশিয়ারা নদীর তীরে এক হাজার ৫০০ দোকান নিয়ে এ মাছের মেলা শুরু হয়েছে। যা আগামী মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত চলবে।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্যরা জানান, ১৮১৪-১৮১৮ সালের দিকে জমিদার থাকাবস্থায় মৌলভীবাজার সদর উপজেলার সত্রস্বতী বাসিন্দা ও পরগনার শ্রী রাজেন্দ্রনাথ দাম ওরফে মথুর বাবু পৌষসংক্রান্তি ও নবান্ন উৎসব উপলক্ষে এ মাছের মেলার প্রচলন করেছিলেন। তবে ঠিক কত সালে এ মেলার প্রচলন হয়েছিল, সেটির কোন সাল পাওয়া না গেলেও ধারণা করা হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ মেলাটির বয়স প্রায় দুইশ বছরের অধিক। জমিদার শ্রী রাজেন্দ্রনাথ দাম ওরফে মথুর বাবু, মৌলভীবাজার শহর থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দুরে হবিগঞ্জ-সিলেট-মৌলভীবাজার এই তিন জেলার মোহনায় এ মেলার প্রচলন করেন। যা এখনো এই মাছের মেলা চলমান রয়েছে।
তারা আরও জানান, প্রতি বছরের মেলায় বড় মাছ ছাড়াও বেত-বাঁশ, কাঠ, লোহা, মাটির তৈরি নানা রকমের পণ্য, শিশুদের খেলনা, নকশীকাঁথা, শীতলপাটি, টাঙ্গাইলের জামদানী শাড়ি, বগুড়ার দই, সবজি, লোকজ পণ্য, কাঠের ফার্নিচার, কৃষি পণ্য, গৃহস্থালি সামগ্রী, মুড়ি-মুড়কি, নানা জাতের দেশীয় খাবারের দোকান থাকে মেলায়। আবহমান বাংলার নানা ঐতিহ্যবাহী পণ্য সামগ্রীর প্রায় দেড় হাজার দোকান নিয়ে ব্যবসায়ীরা এ বছর মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। এছাড়াও মেলায় মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য রয়েছে নাগরদোলা, মোটরসাইকেল রেস, চড়কিসহ নানা ধরণের শিশু খেলনা।
এ মেলায় বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন মাছসহ নানা পণ্য নিয়ে। একসময় শুধু সিলেট অঞ্চলের নদী ও হাওরের মাছ নিয়ে এ মেলা বসলেও, এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় মাছ নিয়ে আসছেন ব্যবসায়ীরা। মৎস্য ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, শুধু বৃহত্তর সিলেটের নয়, এ মেলা পুরো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মাছের মেলা।
সরজমিনে দেখা যায়, মেলা প্রাঙ্গণ লোকারণ্য। মেলা উপলক্ষে চলছে উৎসাহ উদ্দীপনা। কেউ কেউ মেলা থেকে মাছসহ নানা পণ্য কিনছেন। আবার কেউ কেউ মুঠোফোনে দেখা-অদেখা বড় মাছের ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত। বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ মাছ কিনতে ছুটে এসেছেন এই মেলায়। মাছের পাশাপাশি বিশেষ করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনছেন কেউ কেউ। মেলায় বৃহত্তর সিলেটের কুশিয়ারা নদী, সুরমা নদী ও মনু নদী নদী, হাকালুকি হাওর, কাওয়াদিঘি হাওর, হাইল হাওর ও টাংগুয়ার হাওর ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মৎস্য ব্যবসায়ীরা বাঘাইড়, রুই, বোয়াল, আড়ই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, গজারসহ নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির বিশাল বিশাল মাছ নিয়ে পসরা সাজিয়েছে বিক্রি করছেন। বড় মাছের সঙ্গে মেলায় রয়েছে ছোট মাছের দোকানও। মেলায় ছোট আকারের মাছের দাম ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা, মাঝারি সাইজের মাছের দাম ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের মাছের দাম ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকানো হচ্ছে। এবারের মেলায় একটি বাঘাইড় মাছের দাম হাকানো হয় আড়াই লাখ টাকা। যার ওজন ১২০ কেজি।
বিক্রেতা আব্দুর রকিব বলেন, ‘মাছটি দেখতে তার দোকানে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। তিনি মাছটি দেড় লাখ টাকার কমে বিক্রয় করবেন না।’
এ ছাড়া আছকর আলী নামের অপর এক ব্যবসায়ীর দোকানে রয়েছে আরেকটি বাঘাইড় মাছ। যার দাম হাকানো হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ থেকে মাছটি কিনে এনেছেন মেলায় বিক্রয়ের জন্য। তিনি প্রায় ৪০ বছর ধরে এ মেলায় মাছ বিক্রি করতে আসেন।’
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য উজ্জ্বল আহমদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন মাছের মেলা শুরু হয়। প্রায় দুই শতাধিক বছর ধরে এ মেলার আয়োজন হচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারও মেলা উপলক্ষে মানুষের মাঝে খুশির আমেজ বইছে। স্থানীয় অনেক বেকার মানুষের আয়ের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয় মেলাকে ঘিরে। শুধুমাত্র মেলায় আগত মানুষের গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান দিয়ে এলাকার মানুষের দুই থেকে আড়াই লক্ষাধিক টাকা আয় হবে। মেলায় এবার ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার মাছ বিক্রি হবে বলে প্রত্যাশা করছি আমরা। এ বছর মেলার ইজারা ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। মেলায় বসেছে মাছ ছাড়াও নানা পণ্যের আনুমানিক ১ হাজার ৫০০টি দোকান। এবারের মেলা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠানের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।’