রেজাউল করিম লিটন, চুয়াডাঙ্গা
প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৯:৩৮ পিএম
লোকসানের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে আখমাড়াই শুরু করতে যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় চিনিকল চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানী। মাড়াই মওসুম সফল করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে চিনিকল কর্তৃপক্ষ। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের সবচেয়ে বড় এই চিনিকলের বর্তমানে ৬১ কোটি টাকার লোকসানে রয়েছে। চিনি ছাড়াও জৈবসার, ওষুধ ও ডিস্টিলারি কারাখানার সমন্বয়ে বৃহৎ এই শিল্প কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে অব্যাহত লোকসান গুনে আসছিল। সরকারিভাবে চিনির মুল্য বৃদ্ধির কারণে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্প্রতি নতুন নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করে মিলটিতে আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এতে আখ মাড়াই ও চিনি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়বে। তবে এলাকায় আখ চাষ ক্রমাগত কমতে থাকায় সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে ঐতিহ্যবাহি এই চিনিকল।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান শেখ শোয়েবুল আলম বলেন, শুক্রবার বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এবারের মাড়াই মওসুম উদ্বোধন হবে। সব ঠিকঠাক চললে চিনিতে মোটা অংকের লোকসান কমিয়ে আনতে পারবে প্রতিষ্ঠানটি।
এবার ৬৫ হাজার টন আখ মাড়াই করে চার হাজার টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোট ৫৫ মাড়াই দিবসের প্রতিদিন গড়ে ১১৫০ টন আখ মাড়াই করবে চিনিকলটি। উদ্বোধনের সময় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, বাংলাদেশ চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারী ফেডারেশনের নের্তৃবৃন্দ, আখচাচি ও সুধীজন উপস্থিত থাকবেন। তবে আশঙ্কার কথা শুনিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন। তিনি বলেন, চিনিকল এলাকায় আখের চাষ কম হয়েছে। এ জন্য এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকে নেমে আসছে। তাই এবার তিন হাজার ৮১০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বছর চিনিকল জোনে আখ রয়েছে ৩ হাজার ৮০২ একর জমিতে। এর মধ্যে চিনিকলের নিজস্ব জমিতে আখ রয়েছে ১ হাজার ১৫৩ একর জমিতে। চাষিদের দাবির প্রেক্ষিতে এ মওসুমে আখের মূল্য বাড়িয়েছে সরকার। এবার প্রতিমণ আখের মূল্য ২২০ টাকা করা হয়েছে। তবে চাষিরা বলছেন, চিনির মূল্য অনুযায়ী আশানুরূপ হারে আখের মূল্য বাড়েনি। আখের মূল্য আরো বাড়ানোর দাবি চাষিদের। বাংলাদেশ চিনিকল আখচাষি ফেডারেশনের সহ-সভাপতি মো. ওমর আলী বলেন, ‘চিনিকল কর্তৃপক্ষের কাছে আখচাষিদের এবারের দাবি আখের মূল্য সরাসরি নগদে পরিশোধ। শিওর ক্যাশ বা বিকাশে চাসিরা টাকা নেবে না। ঋণের সার, বীজ, কীটনাশক সঠিক সময়ে দিতে হবে এবং চাষিদের কোটায় পাওনা চিনি উত্তোলনের সময় বাড়াতে হবে।’
১৮০৫ সালে জন ম্যাকসওয়েল নামক এক ইংরেজ ভারতের কানপুরে জাগমু নামক স্থানে তখনকার একমাত্র ফরেন লিকার কারখানা চালু করেন। অতঃপর বিভিন্ন সময়ে এর নাম, স্থান, মালিকানা, উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কর্মকান্ড পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হতে থাকে। ১৮৪৭ সালে রবার্ট রাসেল কেরু অংশীদারির ভিত্তিতে যুক্ত হন এবং কালক্রমে তা কিনে নেন। তিনি উত্তর ভারতে অবস্থানকালে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লবের সময় কারখানাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুনর্নির্মাণ করে যৌথ মালিকানায় গঠন করা হয় ‘কেরু এ্যান্ড কোম্পানী লি.’ নামে। পরে আসানসোল ও কাটনীতে এর শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৮ সালে প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১০০০ টন আখ মাড়াই ও ১৮ হাজার লিটার স্পিরিট তৈরির লক্ষ্যে আরও একটি শাখা দর্শনায় স্থাপন করা হয়। পাকিস্তান আমলে আরেক দফা মালিকানা বদলের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা হয়ে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করে।