অর্ণব মল্লিক, কাপ্তাই (রাঙামাটি)
প্রকাশ : ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৪:৪৮ পিএম
আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৬:০৬ পিএম
কাপ্তাইয়ের আঞ্চলিক রেশম গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করছেন এক নারী। প্রবা ফটো
পার্বত্য জেলা রাঙামাটির কাপ্তাইয়ের চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নে অবস্থিত আঞ্চলিক রেশম গবেষণা কেন্দ্র। এটি বাংলাদেশ রেশম বোর্ডের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। আগে অনুদানপ্রাপ্তি সাপেক্ষে এর কার্যক্রম চলত। ফলে গবেষণায় কোনো গতি ছিল না। পরে রেশম চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা সামনে রেখে চন্দ্রঘোনা আঞ্চলিক রেশম গবেষণা কেন্দ্রকে বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করা হলে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কাজের গতিধারায় আমূল পরিবর্তন আসে। শুধু রেশম চাষেই প্রতিষ্ঠানটি সীমাবদ্ধ থাকেনি বরং রেশম গুটি চাষ থেকে শুরু করে রেশমি সুতা তৈরি পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণা কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে এই কেন্দ্র। বর্তমানে এ জেলার রাজস্থলী, কাউখালী, রাঙামাটি সদরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় রেশম চাষ সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে এই গবেষণা কেন্দ্র। বিশেষ করে রেশম চাষে পাহাড়ের প্রান্তিক চাষিদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এতে পাহাড় ঘিরে রেশম চাষে সুবাতাস বইছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ভূপ্রকৃতি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে রাঙামাটি জেলার পার্বত্য অঞ্চলে রেশমের ভালো চাষ হয়ে থাকে। সেইসঙ্গে রেশম চাষে অল্প পরিশ্রম ও কম খরচে অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব হয়। তাই বেকারত্ব দূর করতে এবং পাহাড়ের প্রান্তিক চাষিদের মাঝে রেশম চাষে আগ্রহ বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এ ছাড়া এরই মধ্যে রাঙামাটি জেলার ৭টি উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার চাষি রেশম চাষ করছেন বলে প্রতিষ্ঠানটি সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া এই রেশম চাষ বাড়াতে চাষিদের সর্বোচ্চ সহযোগিতাও করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
চন্দ্রঘোনা আঞ্চলিক রেশম গবেষণা কেন্দ্রের সহযোগিতা নিয়ে রেশম চাষ করে সফলতা পেয়েছেন কাউখালী উপজেলার ব্যাথছড়ির বাসিন্দা রোজিনা বেগম। যিনি রেশম চাষে প্রশিক্ষণ নিয়ে রেশম গুটি চাষ করে বর্তমানে স্বাবলম্বী। বর্তমানে তিনি রেশম গুটি চাষ করে লাখ টাকা আয় করেন। তিনি জানান, তিন মেয়ে ও এক ছেলের এই বড় সংসার চালাতে একসময় অনেক কষ্ট হতো। তবে রেশম গুটি চাষ করে সংসারের চিত্র পাল্টে গেছে। এখন তার সংসারে আর অভাব নেই।
রোজিনা বেগমের মতো কাপ্তাই উপজেলার রেশম চাষি হাসিনা বেগম, সামাপ্রু মারমাসহ অনেক প্রান্তিক চাষি রেশম গুটি চাষ করে সফলতা পাচ্ছেন।
তবে অধিকাংশ চাষি জানান, রেশম চাষটি প্রকল্পের আওতাভুক্ত। তাই প্রকল্প শেষ হলে অনেক সময় চাষিদের বিভিন্ন চিন্তায় পড়তে হয়। তাই প্রকল্পের মেয়াদ এবং অর্থ সহায়তা বাড়ালে রেশম চাষের পরিধি আরও বাড়বে বলে তারা আশা করেন।
আঞ্চলিক রেশম গবেষণা কেন্দ্রের রিয়ারিং হাউসের কর্মকর্তা মো. সেলিম জানান, এই আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে রেশমের প্রায় ৩২টি জাত নিয়ে কাজ করা হয়। তিনি আরও জানান, প্রথম ধাপে সড়কের পাশে কিংবা খালি জায়গায় তুঁত চাষ করা হয়। রেশম পোকার প্রধান খাদ্য হচ্ছে তুঁত গাছের পাতা। তুঁত গাছের কচি পাতাগুলো সংগ্রহ করে ছোট ছোট টুকরা করে পোকাগুলোকে খাওয়ানো হয়। এর পর পোকাগুলো তিন দিন পাতাগুলো খাবে এবং খোলশ পাল্টে দ্বিতীয় ধাপে যাবে। এইভাবে পঞ্চম ধাপে গিয়ে রেশম পোকাগুলো সুতার গুটি দেওয়া শুরু করবে। তবে গুটি দেওয়ার পর পোকাগুলোর জীবনচক্র শেষ হবে না। আবারও পরবর্তীতে প্রজণনের জন্য যাচাই-বাছাই করে এবং প্রক্রিয়াজাত করে পোকাগুলোকে পরিচর্যা করা হয়। এইভাবে গুটি থেকে রেশমি সুতা তৈরির সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটাও ওই প্রতিষ্ঠানে হয়ে থাকে।
এদিকে রাঙামাটি জেলা রেশম চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ সিরাজুর রহমান জানান, আমাদের দেশে রেশমের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন। তবে আমরা সরকারিভাবে মাত্র ৫০ মেট্রিক টন উৎপাদন করছি বাকিটা আমাদের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তাই দেশীয়ভাবে রেশম চাষের উৎপাদন বাড়ানো গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।