হাটহাজারীতে সড়ক দুর্ঘটনা
পটিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ২০:৩৩ পিএম
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩ ২০:৩৬ পিএম
প্রবাসী নারায়ন দাশকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন জোয়ারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ চৌধুরী রোকনসহ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশিরা। প্রবা ফটো
যে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য দেড় বছর আগে দেশ ছেড়ে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছিলেন নারায়ন দাশ; সেই মানুষগুলো আজ কেবলই স্মৃতি। নির্মম সড়ক দূর্ঘটনায় তাদের সবাইকে হারিয়ে আজ বড্ড একা তিনি, শোকের কাতরতায় হারিয়ে ফেলেছেন মুখের ভাষা।
মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের সাত সদস্য নিহত হন। যাদের মধ্যে ছিলেন নারায়ন দাশের স্ত্রী রিতা রানী দাশ , দুই কন্যা শ্রাবন্তী দাশ, বর্ষা দাশ এবং যমজ দুই পুত্র সন্তান দ্বীপ দাশ ও দিগন্ত দাশ। এছাড়াও দূর্ঘটনায় নিহত হন নারায়ন দাশের ভাইয়ের ছেলে বিপ্লব দাশ এবং বোন চিনু দাশ।
দূর্ঘটনার দিন রাতেই এ্যাম্বুলেন্সে করে নিহত ৭ জনের লাশ নিয়ে আসা হয় চন্দনাইশ উপজেলার মোহাম্মদপুর গ্রামের ধোপাপাড়ার মৃত ভোলা দাশের বাড়িতে। এসময় স্বজনদের আহাজারীতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে।
বুধবার (৮ নভেম্বর) সকালে ধোপাপাড়া গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির সামনের রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে রাখা আছে ৬টি এম্বুলেন্স। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এলাকার হাজারো মানুষ নিহতদের একনজর দেখতে এসেছেন। সবার চোখই ছিল অশ্রুজল।
প্রিয়জনদের চিরতরে বিদায় দিতে গতকাল সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে ওমান থেকে দেশে ফিরেন নারায়ন দাশ। বাড়িতে এসে অ্যাম্বুলেন্সে থাকা প্রতিটি লাশ দেখলেনই শুধু, কান্না ছাড়া কোনো ভাষাই ছিলো না তার।
ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুর ১২টার পর একে একে সবার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির পার্শ্ববর্তী শ্মশানে। নারায়নের শিশুকন্যা বর্ষা, শিশুপুত্র দ্বীপ ও দিগন্তকে সমাহিত করা হয়। দাহ করা হয় তার স্ত্রী রিতা রানী দাশ ও বড় মেয়ে শ্রাবন্তী দাশ এবং ভাইয়ের ছেলে বিপ্লব দাশকে। নারায়নের বোন নিহত চিনু দাশকে নেয়া হয় উপজেলার সাতবাড়িয়া যতরকুল এলাকায়। দুপুরে সেখানে হয় তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান।
চন্দনাইশের সাধারণ মানুষ এমন মর্মান্তিক দূর্ঘটনার স্বাক্ষী হবেন, তা কল্পনাও করেননি। সকাল ১১টায় দূর্ঘটনার আগেও হাসি আনন্দে মেতে ছিলেন তারা। সবাই মিলে যাচ্ছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলায় এক আত্মীয়ের শেষকর্ম অনুষ্ঠানে।
নারায়ন দাশের বড় ভাই শারীরিক প্রতিবন্ধী শম্ভু দাশ। স্ত্রী, তিন ছেলের মধ্যে একমাত্র উপার্জক্ষম ছিল বিপ্লব দাশ (৩২)। দূর্ঘটনায় বিপ্লবের মৃত্যুতে শম্ভু দাশের সংসারের আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে গেলো। স্ত্রী কাঞ্চন বালা দাশও বড় ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। ঘরের দাওয়ায় বসে আর্তনাদ করছেন তিনি।
নিহত রিতার বড় জা মল্লিকা দাশ জানান, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় তার ছোট জা রিতার নানার বাড়ি। গত মাসে রিতার নানী মারা যায়। মঙ্গলবার ছিল নানীর কর্ম অনুষ্ঠান। ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রিতার সঙ্গে পরিবারের অন্যান্যরাও যাচ্ছিলেন। সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে সিএনজিযোগে মইজ্যারটেক যায়। সেখান থেকে অপর একটি সিএনজিযোগে ফটিকছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের বোর্ড স্কুল এলাকায় পৌছলে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগতির একটি যাত্রাবাহীবাসের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় সবাই। মল্লিকা দাশ বলেন, দ্বীপ ও দিগন্ত সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখতো পুরো বাড়ি। কতবার নিজ হাতে তাদের খাইয়েছি, জামা-কাপড় পরিয়েছি। কান্না করতে করতে তিনি বলেন, আর কাকে ভাত খাইয়ে দিবো, কাপড় পড়িয়ে দিবো।
জোয়ারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ চৌধুরী রোকন বলেন, এমন হৃদয় বিদারক দূর্ঘটনা চন্দনাইশে আর দেখিনি। একই পরিবারের নিহত ৭ জনের মধ্যে নারায়ন দাশের স্ত্রী, ফুটফুটে দুই কন্যা ও যমজ দুই পুত্র সন্তান রয়েছে। সবচেয়ে খারাপ লাগছে তার জন্য। সে কিভাবে এমন ঘটনা সহ্য করবে জানি না। সৃষ্টিকর্তা তাকে ধৈয্য ধারণ করার ক্ষমতা দিক। এসময় তিনি দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাসচালককে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান প্রশাসনের কাছে।
দুপুর সাড়ে ১১টারয় চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার চৌধুরী, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য আবু আহমদ চৌধুরী জুনু আসেন নারায়নের বাড়িতে। এসময় তারা নারায়ন দাশকে শান্তনা দেন এবং সরকারিভাবে জেলা পরিষদ থেকে দেড় লাখ টাকার অনুদান প্রদান করেন। এছাড়া লাশ নিয়ে আসা এবং শেষকৃত্যানুষ্ঠানের যাবতীয় খরচ উপজেলা পরিষদ বহন করবে বলেও জানান উপজেলা চেয়ারম্যান।