জয়পুরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:১২ পিএম
আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৩ ১৫:৩৮ পিএম
শেখপাড়া সাচ্চাপীর সিদ্দিকিয়া দাখিলা মাদ্রাসা। প্রবা ফটো
সাধারণত কোনো পণ্য কেনার জন্য ফর্দ বা বাজারের তালিকা করা হয়। তবে এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগবাণিজ্যের টাকা ভাগাভাগির জন্য ফর্দ হয়েছে। ওই ফর্দ অনুযায়ী ৫৬ খাতে দেওয়া হয়েছে ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৭০ টাকা। এর মধ্যে ডিজির প্রতিনিধি ও শিক্ষা কর্মকর্তার ‘সম্মানী’র কথাও উল্লেখ আছে। পরিচালনা কমিটির সম্মানী ৫ লাখ ৩০ হাজার ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের সভাপতি একাই নিয়েছেন ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সম্প্রতি জয়পুরহাট সদর উপজেলার শেখপাড়া সাচ্চাপীর সিদ্দিকিয়া দাখিলা মাদ্রাসার সুপারের প্রতিষ্ঠান বদলের খবরে ওই তালিকা সামনে এনেছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা। এই অনিয়মের জন্য সভাপতি মাজেদুর রহমান ও সুপার আব্দুল জলিলকে দায়ী করছেন তারা। ঘটনাটি তদন্ত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১ অক্টোবর বদলগাছী উপজেলা নুনুজ আলিম মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে সুপার আব্দুল জলিল যোগদান করেছেন। এরপর ১০ দিন অতিবাহিত হলেও কোনো কাগজপত্র ও দায়িত্ব বুঝে না দেওয়ায় ১১ অক্টোবর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন সহসুপার রুহুল আমিনসহ শিক্ষকরা। পরবর্তীতে ১৬ অক্টোবর আব্দুল জলিল পদত্যাগ করেন।
তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৫৬ খাতে ব্যয় করার হিসাবে মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ হিসাব লেখা রয়েছে। সেখানে নৈশপ্রহরীর গৃহ নির্মাণের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাসহ মাদ্রাসার আনুষঙ্গিক আসবাবসহ ৩৩ খাতে ৫ লাখ ৮ হাজার ৫৫০ টাকা দেখানো হয়েছে। আরও ২৩ খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪ লাখ ৫৬ হাজার ৭২০ টাকা। এর মধ্যে নিয়োগ বোর্ডে আসা ডিজির দুই প্রতিনিধির জন্য ২ লাখ, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার জন্য ১ লাখ, এক চেয়ারম্যানের ঋণ পরিশোধে ৮০ হাজার, কমিটির সম্মানী ৫ লাখ ৩০ হাজার, সভাপতি মাজেদুর রহমান নিয়েছেন ৯ লাখ ৫০ হাজার, তৌহিদের (নৈশপ্রহরী) নিয়োগ বোর্ডে খরচ ২ লাখ ৩৬ হাজারসহ আরও কয়েকটি খাতে ব্যয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। এতে মোট খরচের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৭০ টাকা। তালিকাটি নিজ হাতে মাদ্রাসার সুপার লিখেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তবে পুরো বিষয়টি অস্বীকার করেছেন সভাপতি।
সহসুপার (ভারপ্রাপ্ত সুপার) রুহুল আমিন বলেন, ‘সুপার অন্যত্র যোগদান করলেও এই প্রতিষ্ঠানে পদত্যাগ করেননি। পরে এটি নিয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। আর্থিক অনিয়ম হয়েছে এটি অনেক পরে জেনেছি। এর কারণ কমিটির মিটিং চলার সময় সেখানে যেতে দেওয়া হতো না। একটি মিটিং থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তালিকায় তিনি (সুপার) নিজ হাতে লিখেছেন ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ২৭০ টাকার হিসাব। তবে কোনো জমার উল্লেখ নেই। এই টাকা কোথা থেকে এলো, এটির বিষয়ে সুপার বলেছেন টাকার হিসাব আপনাকে কৈফিয়ত দেব না। কমিটি বুঝবে, আর আমি বুঝব। সভাপতিও তা-ই বলেছেন।’
টাকার উৎস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া তিনজনের কাছ থেকে ৩১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নিরাপত্তাকর্মী আশরাফুলের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১৩ লাখ টাকা, আয়া মরিয়মের কাছ থেকে ১১ লাখ ও নৈশপ্রহরী তৌহিদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৭ লাখ টাকা।’
টাকা দেওয়ার বিষয়ে নিরাপত্তাকর্মী আশরাফুল ও আয়া মরিয়ম এড়িয়ে গেলেও নৈশপ্রহরী তৌহিদ স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কয়েক দফায় ৭ লাখ টাকা দিয়েছি। ডকুমেন্টও আমার কাছে আছে।’
তালিকাটি নিজের হাতে লেখা বলে নিশ্চিত করে সাবেক সুপার আব্দুল জলিল বলেন, এই ফর্দ মেইন ফ্যাক্টর। আমি বারবার সভাপতিকে বলেছি এমন কাজ করতে যাবেন না। লিখিত এসব তালিকা করার দরকার নেই। লেখার পর স্কিনশর্ট (ছবি) নেওয়া হয়েছে। সেগুলো আপনাদের কাছেও আছে দেখছি।’ পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছিলাম। সেটির ছাড়পত্রও দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ৮ অক্টোবর পদত্যাগপত্র দিয়েছি।’
সভাপতি মাজেদুর রহমান ধলাহার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তিনটি পদে সম্প্রতি নিয়োগ হয়েছে। নিয়োগে কোনো টাকা-পয়সা নেওয়া হয়েছে বলে জানা নেই। তালিকা যেটি হয়েছে, সেটি সত্য নয়।’
নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া নিয়োগে ডিজির প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিপ্তরের পরিদর্শক মুহম্মদ হোসাইন। তিনি বলেন, ‘সম্মানীর জন্য ছোট্ট একটি খাম দেওয়া হয়েছিল। সেখানে সম্ভবত তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ছিল। আর নৈশপ্রহরী নিয়োগে ডিজির প্রতিনিধি ছিলেন একই অধিদপ্তরের কন্ট্রোল অপারেটর রিপন মিয়া। সম্মানীর বিষয়ে জানতে চাইলে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে তিনি কল কেটে দেন।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমার জানামতে, সুপার ওই প্রতিষ্ঠানে ৮ তারিখ কাজ করেন এবং তিনি ১ তারিখে নুনুজ কলিমিয়া আলিম মাদ্রাসায় যোগদান করেন। এটা আসলে তার (আব্দুল জলিল) বিধিসম্মত হয়নি। আমিও একজন নিয়োগ বোর্ডের সদস্য। ডিজির প্রতিনিধিও থাকেন। টাকা কে নিয়েছেন সেটা বলতে পারব না। একবার ওই প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছিল। পরবর্তীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শিশির কুমার উপাধ্যায় বলেন, ‘নিয়োগব্যাণিজ্যের কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে।’