রাকিবুল ইসলাম, রায়পুর (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:১২ পিএম
এমপির নির্দেশনাও মানছেন না অবৈধ বালু ব্যবসায়ীরা। চলছে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। প্রবা ফটো
‘কে শুনবে কার কথা’ সরকার বলেন, উচ্চ আদালত কিংবা স্থানীয় এমপি বলেন, কারও নির্দেশনাই মানছেন না লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের বালুদস্যুরা। প্রতিদিন প্রায় ৩০টি ড্রেজার দিয়ে নদীর চরঘেঁষে বালু উত্তোলনের মহোৎসব চলমান। এমনকি ড্রেজার লাগিয়ে মেঘনা চরের ফসলি জমি পর্যন্ত কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে চরে ব্যাপকভাবে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা বর্ষা মৌসুম শেষে এর প্রভাবে (বালু উত্তোলনে) ভাঙন বাড়বে নদীতে। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, গত বছর জেলার রায়পুর উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক দিন টানা অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ ড্রেজার মেশিনগুলো জব্দসহ মোটা অঙ্কের জরিমানা করার পর কয়েক দিন বন্ধ থাকলেও আবার ড্রেজার চালানো শুরু হয়। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন গত বছর ২২ আগস্ট জনসচেতনতামূলক সভা করে ড্রেজার চালাতে নিষেধ করার পরও থামছেন না অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়রা জানান, প্রভাবশালীরা ড্রেজার লাগিয়ে চরের ফসলি জমির মাটি কেটে নিচ্ছেন। এতে করে সংশ্লিষ্ট জমিতে বিভিন্ন ফসলি জমি ভেঙে পড়ায় কৃষকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ ছাড়াও ড্রেজার দিয়ে মাটি কেটে ফেলার কারণে চরে ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এতে নদীর তীরবর্তী গ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে গ্রামবাসীর মাঝে।
সর্বশেষ গত চার মাস আগে দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের দুই ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার করে মোট ১ লাখ টাকা জরিমানা করে রায়পুর উপজেলা প্রশাসন।
কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিলে তাকে আটকিয়ে মারধর করা হয় এবং আমাদের বাজারে উঠতে দেওয়া হয় না, আমাদের ফসলি জমি তারা কেটে নিয়ে যায়, নদীর পাড়ের ঘরবাড়ি সব ভেঙে পড়তে শুরু করেছে।
অবৈধ ড্রেজার চালানোর অপরাধে গত বছর ৮নং দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ইউপি সদস্য দিদার মোল্লাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে রায়পুর উপজেলা প্রশাসন।
স্থানীয় কয়েকজন জানান, ওই জরিমানার পর দিদার মোল্লা এখন দুলাল মোল্লা নামে একজনকে দিয়ে তার ড্রেজার ব্যবসা পরিচালনা করেন। কেউ কিছু বললে তাকে এলাকা থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন
অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীরা হলেন, ৮নং দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার দিদার মোল্লা, যদিও দিদার মোল্লা সরাসরি জড়িত না হয়ে দুলাল মোল্লা নামে একজনকে দিয়ে এই ড্রেজার পরিচালনা করেন। ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি হারুন মোল্লা, মিয়ার হাটের হাসেম চৌকিদার, নজরুল মেম্বারের ভাই বাবুল বেপারী, রাহুলের ঘাট পরিচালনা করেন মাসুদ, পানির ঘাটে বাবুল মোল্লা, পানির ঘাটসংলগ্ন বালুর মাঠে দুলাল সৈয়েল, হাজী মারায় জামাল, সরকারের দেওয়া আশ্রয়ণের ফারুক সৈয়েল ও জুলহাস মোল্লা, সয়াল গোবাজারে মোতালেব চৈয়েল, মিন্টু মোল্লা,
উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নের তুলাতুলি স্থানে আমির হোসেন, সোহেল হাওলাদার, আরিফুর রহমান মিস্টার, শহর আলী মোড়ে হারুন খাঁ ও পুরান বেরির পূর্ব মাথায় মোহাম্মদ আলী খাঁ, আলমগীর বেপারী ও মনির, তালতলায় বিল্লাল কবিরাজ ও ঝাউডুগি গ্রামের মো. কামাল এবং আনোয়ার।
মেঘনাপাড়ের রাহুল ঘাটেও ড্রেজারের রমরমা ব্যবসা চলছে। অবৈধ বালু উত্তোলনের জেরে গত ফেব্রুয়ারি মাসে ঘটে হত্যাকাণ্ডও। কিশোর হত্যার ঘটনায় আলোচিত সেই রাহুল জেলে যেতেই শুরু হয় ভাগাভাগি। তার ড্রেজার ব্যবসার অবস্থা নিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী হাসেম চৌকিদার। এদিকে রাহুল জেলে থাকা অবস্থা ও জেল থেকে বেরিয়ে এলাকায় না থাকলেও তিনি মাসুদ নামের এক লোককে নির্দেশনা দিয়ে তার এই অবৈধ ড্রেজার ব্যবসা চলমান রাখছেন।
ড্রেজার ব্যবসায়ী হাসেম চৌকিদার বলেন, ‘যতই লেখেন লাভ হবে না, ওপর থেকে অনুমতি নিয়ে চালাচ্ছি। দরকার হলে কিছু খরচ নিয়ে যান, ফাও ফাও ঝামেলা করে লাভ হবে না।’
সূত্র বলছে, ড্রেজার ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক রূপ নিয়েছে সাপ-নেউলের ন্যায়। জড়িত চৌকিদার, জনপ্রতিনিধি, ইউনিয়ন প্রভাবশালীদের একটি অংশ। সে তালিকায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা।
ইউপি সদস্য দিদার মোল্লা বলেন, ‘আমি কোনো ড্রেজার ব্যবসায় জড়িত না, যদি কেউ আমার নাম ব্যবহার করে ড্রেজার চালায়, তাহলে আমি কী করব, আর কে আমার নাম বলছে, তার নাম আমাকে বলেন, আমি তাকে দেখে নেব। আপনি সাংবাদিক যদি আমার নাম পত্রিকায় দেন, তাহলে আমি আপনার বিরুদ্ধে মামলা করব।’
বিল্লাল কবিরাজ নামে এক ড্রেজার ব্যবসায়ী জানান, আমরা ৮-১০ জন ব্যবসায়ী কিছুদিন আগে এমপি সাহেবের কাছে গিয়ে মৌখিকভাবে অনুমতি নিয়েছি।
এ বিষয়ে স্বীকার ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে ৮নং দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিন্টু ফরাজি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যারা ড্রেজার চালায়, তারা খুব প্রভাবশালী। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল আমাকে বাদী হয়ে মামলা করার জন্য। আমি যদি মামলা করি, তাহলে তো আমাকে ইউনিয়ন পরিষদে ঢুকতে দেবে না ও গুলি করে মেরে ফেলবে। আমাকে নিরাপত্তা দেবে কে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘মেঘনা নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন জানতে পেরেছি। বর্তমানে রায়পুরে তিনটি ইউনিয়ন ভাঙন হুমকিতে। এখন বর্ষাকাল, তা শেষ হলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সহসাই নদী রক্ষা কমিটির সভায় আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অন্জন দাশ বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি, যখনেই খবর পাই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেই। আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বাদী হয়ে মামলা করবেন। অভিযান চলমান রয়েছে। খোঁজ পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন বলেন, ‘আমি গত বছর তাদের নিষেধ করার পর কিছুদিন বন্ধ ছিল। শুনছি এখন তারা আবার ড্রেজার চালানো শুরু করছে। কেন তারা নির্দেশনা মানছেন না, তার কারণ জানব। এ বিষয়ে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।’