× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভাঙছে তিস্তা, হারাচ্ছে ভূমি

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, কুড়িগ্রাম

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৩১ এএম

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৪৩ এএম

প্রতি বছর ভাঙনে সংকুচিত হচ্ছে কুড়িগ্রামের মানচিত্র। রাজারহাট উপজেলার রামহরি এলাকা থেকে তোলা ছবি।

প্রতি বছর ভাঙনে সংকুচিত হচ্ছে কুড়িগ্রামের মানচিত্র। রাজারহাট উপজেলার রামহরি এলাকা থেকে তোলা ছবি।

তিস্তার ভাঙন খেলায় গত দুই দশকে ভিটেমাটি হারিয়ে ভূমিহীন হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার। নিঃস্ব এসব পরিবারের ঠাঁই হয়েছে বেড়িবাঁধ কিংবা অন্যের বাড়িতে। যাদের বিঘায় বিঘায় জমি ছিল, ছিল পুকুর ভরা মাছ আর গোয়াল ভরা গরু, তারা এখন কামলা (দিনমজুর)। 

তিস্তা মহারিকল্পনার দোলাচলে থমকে আছে এসব পরিবারের ভাগ্যের চাকা। তিস্তা মহাপরিকল্পনার কার্যক্রমের অপেক্ষার অজুহাতে দিনে দিনে তিস্তাগর্ভে বিলীন হচ্ছে জেলার রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলা তথা কুড়িগ্রামের মেইনল্যান্ড। পাউবোর আপদকালীন বরাদ্দ কাজে আসছে না এখানকার মানুষের। তাই আর বিলম্ব না করে অবিলম্বে স্থায়ী সমাধান চায় তিস্তা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত চরাঞ্চলের মানুষ।

প্রায় ২৪০ বছরের পুরোনো নদী তিস্তার সঙ্গে রয়েছে উত্তরের ২৫টি নদীর প্রবাহ। ২০১৪ সাল থেকে ভারত সরকার একতরফা তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীটি একেবারেই শুকিয়ে যায়। নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম জেলার রাজাহাট, উলিপুর, চিলমারী, রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তিস্তা। তবে শুষ্ক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলা। এ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিই তিস্তা নদীবেষ্টিত। নদী শাসন না হওয়ায় গত পাঁচ বছরে গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তিস্তাপাড় হয়ে উঠবে চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির মতো সুন্দর নগরী।

চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সুকিয়ান সিটির আদলে তিস্তার দুই পাড়ে পরিকল্পিত স্যাটেলাইট শহর, নদী খনন ও শাসন, ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আধুনিক কৃষি সেচব্যবস্থা, মাছ চাষ প্রকল্প, পর্যটনকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। এতে ৭ থেকে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। চায়না পাওয়ার কোম্পানি দুই বছর ধরে তিস্তাপাড়ে নির্মিতব্য প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে। তিস্তা নদীর পাড়ের জেলাগুলো কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধায় চীনের তিনটি প্রতিনিধিদল কাজ করেছে। কিন্তু দফায় দফায় বৈঠক আর প্রতিশ্রুতিতেই ঝুলে আছে তিস্তা মহাপরিকল্পনার অগ্রগতি।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় ইতোমধ্যে নদীভাঙনে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রামসহ বসতবাড়ি, আবাদি জমি, স্কুল-কলেজ, ধর্মীয় স্থাপনা এবং আবাদি জমি। প্রতি বছর শুকনো ও বর্ষা মৌসুমে সমান তালে ভাঙনে বিলীন হয়ে সব হারিয়ে নির্বাক তিস্তাপাড়ের মানুষ। এখন নদীভাঙনে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার একাংশের মানুষ।

রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার শেষ সীমানা থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারী পর্যন্ত ৪৩ কিলোমিটারব্যাপী তিস্তা নদীর অবস্থান। এই দীর্ঘ নদীপথে মাত্র দুই কিলোমিটার জায়গায় স্থায়ীভাবে প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও বাকি ৪১ কিলোমিটার জায়গা উন্মুক্ত রয়েছে। এসব উন্মুক্ত অঞ্চলের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে তাতে নদীর পাড় রক্ষা করা যাচ্ছে না। প্রতি বছর নতুন নতুন জায়গায় ভাঙন শুরু হওয়ায় বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদি জমি ক্রমশ নদীগর্ভে যাচ্ছে। চরম হুমকির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও মসজিদ-মন্দির। 

বর্তমানে রাজারহাটের ঘরিয়ালডাঙ্গা ও বিদ্যানন্দ ইউনিয়নে ছয় কিলোমিটার এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে। অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু বগুড়াপাড়া, রামহরি, খিতাবখাঁ ও বুড়িরহাটে তীব্র ভাঙনে কয়েক দিনে দুই শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। যারা ভাঙনের মুখে রয়েছে, তারা ভাঙন প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষকের কাছে ধরনা দিচ্ছে।

চর খিতাবখাঁ গ্রামের লস্কর আলী বলেন, ‘পৈতৃক সূত্রে দুই একর জমি ছিল আমার। কিন্তু গত পাঁচ বছরে তিস্তার ভাঙনে সাতবার বাড়ি নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন এক শতক জমিও নেই। পার্শ্ববর্তী গ্রামের শাহজাহানের বাড়িতে বছরে ৫০০ টাকা ভাড়া শর্তে ঘর উঠিয়েছি। সেখানেই আছি। আমার মতো অবস্থা এ এলাকার অধিকাংশ মানুষের। এখন দিনমজুরের কাজ করে তিন সন্তানসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাতে হয়।’ 

রাজারহাটের ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের সরিষাবাড়ী গ্রামের মোক্তার আলী বলেন, ‘গত ৩-৪ বছরে পাঁচবার নদীতে বসতবাড়ি হারিয়েছি। এখন কিছুই নাই আমার। আল্লাহই জানে আমাদের কপালে কী আছে। সরকার তিস্তা মহাপরিকল্পনার কথা বলেই যাচ্ছে, কিন্তু কাজ আর হচ্ছে না। আমরা প্রতি বছর ঘরবাড়ি হারিয়ে ফকির হচ্ছি, আর সরকার বসে বসে তামাশা দেখে।’ 

ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহে ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডেই ৭০টি পরিবারের বাড়িঘর, বসতভিটা তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দফায় দফায় ডিসি ও পাউবো কর্তৃপক্ষকে আমার গ্রাম রক্ষায় আবেদন করেছি, তারা এসে দেখেও গেছেন, কিন্তু কাজ আর হচ্ছে না। চোখের সামনে যখন এসব মানুষের ঘরবাড়ি-আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে যায় তখন তাদের কী সান্ত্বনা দেব। তিস্তা মহাপরিকল্পনা যখন হবে, তখন কাজ করবে সরকার। এখন তিস্তা মহাপরিকল্পনার আশায় আমরা গ্রামবাসী আর কতদিন বসে থাকব?’ 

কুড়িগ্রাম-২ আসনের (ফুলবাড়ী, রাজারহাট-কুড়িগ্রাম) সংসদ সদস্য পনির উদ্দিন আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ওপর আমাদের আস্থা আছে। সংসদে একাধিকবার তিস্তা মহাপরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরে তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য উত্থাপন করেছি। প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক অস্থিরতা কেটে গেলে এবং বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় এলে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা আশা করি সরকার আবারও ক্ষমতায় আসবে এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে ইনশাআল্লাহ।’

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাইরেও কুড়িগ্রামে নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা বাম তীর সংরক্ষণ প্রকল্প নামে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সমীক্ষার কাজও শেষ হয়েছে। এখন প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণের কাজ চলছে। আমরা আশা করি প্রকল্পটি পাস হলে তিস্তাপাড়ের মানুষ চিরতরে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে।’

এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরিফ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীকে রংপুর সফরের সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কুড়িগ্রামের ৩০২ কিলোমিটার নদী এলাকা। এর মধ্যে ৮০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কাজ চলছে। বাকি অংশগুলোতে স্থায়ী বাঁধ দিতে পারলে কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে কুড়িগ্রাম জেলা। ভৌগোলিক কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি কুড়িগ্রামে। এজন্য কৃষিনির্ভর অর্থনীতি বাস্তবায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা স্থায়ী নদী শাসনের কোনো বিকল্প নেই। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রী উত্তরাঞ্চলের মানুষের কথা বিবেচনা করে দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা