রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী অফিস
প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৩ ২১:১৫ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ফাইল ছবি
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এম আবদুস সোবহানের মেয়ে ও ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি বিভাগের প্রভাষক সানজানা সোবহানকে শিক্ষাছুটি স্থগিত করে যথাসময়ে যোগদান না করায় কারণ দর্শাতে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত ২১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত নোটিশ ওই প্রভাষককে দেওয়া হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, গত ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত ৫২৪তম সিন্ডিকেট সভার ২৫ নম্বর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আপনি কেন শিক্ষাছুটি বাতিলের আদেশ জারি ও প্রাপ্তির পরও দেশে না ফিরে অনুনমোদিতভাবে কোন অধিকার বলে বিদেশে অবস্থান করছেন, কেন আপনি যথাসময়ে বিভাগে যোগদান করেননি এবং কেন তদন্ত কমিটি ও বিশ্ববিদ্যালয়কে অসহযোগিতা ও অবজ্ঞা করেছেন এবং সিন্ডিকেটের আদেশ অমান্য করে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন, তার ব্যাখ্যা দেওয়ার অনুরোধ করা হলো।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, এই পত্রের উত্তরপ্রাপ্তির পর আপনার বিভাগে যোগদান বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাবি প্রশাসনের এই নোটিশ প্রসঙ্গে সানজানা সোবহান বলেন, আমি সব নিয়ম মেনেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট পূর্ণবেতনে আমার শিক্ষাছুটিও মঞ্জুর করে। আমার ডিগ্রি শেষ হতে যখন সাত মাস বাকি, তখন হঠাৎ করেই আমাকে জানানো হয় আমার ছুটি মঞ্জুর হয়নি। অতিসত্বর আমি যেন বিভাগে যোগদান করি। স্কলারশিপের শর্তানুযায়ী, মাঝপথে ডিগ্রিটি ছেড়ে দিলে আমাকে প্রায় ৪২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতো। তাই, পুনরায় ছুটির আবেদন করি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৭ মাস পর জানায়, যে তারা আমার পুনরায় করা ছুটির আবেদনটি আমলে নেয়নি। আমি ২৪ মে বিভাগে যোগদানও করেছি, এখন দেখছি নানা অভিযোগে আমার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে।
এদিকে সানজানা সোবহানের শিক্ষাছুটি সংক্রান্ত বেশ কিছু চিঠি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর কোর্সের জন্য স্কলারশিপ পান সানজানা। ২০২২ সালের ৯ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে দেড় বছরের শিক্ষাছুটি দেওয়া হয়। একই বছরের ৮ মে ছুটি চলাকালে তার বেতন চালু রাখার বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে মর্মে আরেকটি চিঠি দেওয়া হয়।
২০২২ সালের ২৬ জুলাই অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ড. শেখ সাদ আহমেদ স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতে বলা হয়, ৫১৫তম সিন্ডিকেট সভার ৪৫ নম্বর সিদ্ধান্ত মোতাবেক আদিষ্ট হয়ে জানাচ্ছি যে, আপনাকে ২০২২ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের জুলাইয়ের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ১ বছর ৫ মাস শিক্ষাছুটি পূর্ণবেতনে মঞ্জুর করা হয়েছে।
তবে এর তিন মাস পর আরেকটি চিঠিতে বলা হয়, সানজানার ছুটি শিক্ষা পরিষদ সভার ৪৫ নম্বর সিদ্ধান্ত এবং ২০২২ সালের ৮ জুলাই অনুষ্ঠিত ৫১৫তম সিন্ডিকেট সভার ৪৫ নম্বর সিদ্ধান্ত মোতাবেক সানজানার ওই শিক্ষাছুটির আবেদন অনুমোদিত হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সানজানা সোবহানের পুনরায় করা আবেদনটি বিবেচনায় না নিয়ে পূর্বের সিদ্ধান্ত বহাল আছে মর্মে আরেকটি চিঠি দেয় চলতি বছরের ১০ মে। তবে শিক্ষাছুটি শেষ করে সানজানা বিভাগে যোগ দেন চলতি বছরের ২৫ মে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালাম সানাজানার শিক্ষাছুটি প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে শিক্ষাছুটির বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলের অনুমোদনের পর সিন্ডিকেটে যায়। সাবেক উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের জামাতা ও আইবিএর শিক্ষক এটিএম শাহেদ জামানের নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও তদন্ত চলছিল। তদন্ত কমিটি সাবেক উপাচার্যের মেয়ে সানজানা সোবহানের বিষয়েও কিছু অভিযোগ করে। পরে একাডেমিক কাউন্সিলেও বিষয়টি আলোচিত হয় এবং সানজানার শিক্ষাছুটি স্থগিত করা হয়।
সানজানা সোবহানকে দেওয়া ২১ আগস্টের চিঠির প্রেক্ষিতে রেজিস্ট্রার জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সানজানার কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে, তিনি সেগুলো দেবেন। এরপর সেগুলো সিন্ডিকেটে যাবে। সিন্ডিকেট পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত জানাবে।
এদিকে ছুটি স্থগিত করা হলেও সানজানার বেতন চালু রাখা প্রসঙ্গে কোনো চিঠি বা আদেশ দেয়নি প্রশাসন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে ট্যুরিজম বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সানজানার বেতন এবং অন্যান্য সুবিধা চলমান আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হেনস্তা করতে এসব করছে উল্লেখ করে সানজানা বলেন, আমি সাবেক উপাচার্যের মেয়ে—সে কারণেই আমার বিরুদ্ধে এসব করা হচ্ছে। কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই, আমি কোনো মার্ডারের আসামিও না, সব নিয়ম মেনেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গিয়েছি; তাহলে আমার ত্রুটি কোথায়?
সানজানা আরও জানান, আর্থিকভাবেও আমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। শিক্ষাছুটি থেকে ফিরে আসার পর স্যালারিটার একটা ফিক্সেশন হয়, কিন্তু এখনও পর্যন্ত আমার সেটি হয়নি। আমার প্রমোশনের জন্য নিয়োগ বোর্ডও গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেটিও বাতিল করা হয়। আমার প্রমোশনটি আটকে রাখা হয়েছে।
সোবহান উপাচার্য থাকাকালে তার মেয়ে সানজানা এবং জামাতা এটিএম শাহেদ পারভেজের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক তদন্তে উপাচার্যসহ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অন্যদের বিরুদ্ধে ২৫টি অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। তার মধ্যে, উপাচার্য ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা শিথিল করে তার কন্যা ও জামাতাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, এই অভিযোগের সত্যতা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়। এরপর ২০২০ সালে ১০ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নিয়োগ স্থগিতের নির্দেশনা দেওয়া হয়।