রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৩ ১৬:০৩ পিএম
গাজীপুর সদর উপজেলার নলছটা এলাকায় বেলাই বিল ভরাট করে নির্মাণ করা হচ্ছে পাকা স্থাপনা। প্রবা ফটো
গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল বাজারের পাশে বালু নদ থেকে বালি তুলে ভরাট করা হচ্ছে বেলাই বিল। এতে বিলের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, হারাচ্ছে দেশি মাছের আবাসস্থল। পাশাপাশি বিলের জমির মালিকদের নামমাত্র টাকা দিয়ে দখল করে ভরাট করার অভিযোগ উঠেছে দুটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। এদিকে বিল ভরাট বন্ধ রাখার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূবাইল ব্রিজের নিচে বালু নদ থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করছে তেপান্তর ও নর্থ সাউথ নামের দুটি আবাসন প্রতিষ্ঠান। টঙ্গী-ঘোড়াশাল মহাসড়কের পাশ দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে নলছাটা পর্যন্ত মোটা পাইপ দিয়ে বালি ফেলছে তারা। এলাকাটি গাজীপুর সদরের নলছাটা ও বাড়িয়া মৌজার মধ্যে পড়েছে।
ঢাকার কাছের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের মধ্যে অন্যতম বেলাই বিল। বর্ষা মৌসুমে এই বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। এ ছাড়াও দেশি মাছের অভয়ারণ্য এই বিল। অন্য মৌসুমে বিস্তৃত এলাকায় আবাদ হয় ধান। তবে ওই দুই প্রতিষ্ঠান এলাকাবাসীকে প্রলোভন দেখিয়ে জমি ভরাট করছে। এতে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কমে যাচ্ছে মাছ, ধ্বংস হচ্ছে স্থলজ ও জলজ প্রাণ-প্রকৃতি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্ষার পানিতে টইটুম্বুর বেলাই বিল। মাঝখানে বিস্তৃত এলাকা দ্বীপের মতো জেগে উঠেছে। দ্বীপগুলোর কোথাও কাশবন, কোথাও মরুভূমির মতো চিকচিক করছে বালি। আসলে দ্বীপের মতো মনে হলেও এগুলো দ্বীপ নয়, বিল ভরাটের উঁচু স্থান। এসব স্থানে নিজেদের স্বত্বাধিকারী দাবি করে বিভিন্ন সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ভরাটকৃত জমির বাইরেও পানিতে দেখা মেলে নানা রঙের সাইনবোর্ডের। পানির মধ্যেই নির্মাণাধীন রয়েছে পাকা ভবন।
যেখানে বিল ভরাট করা হচ্ছে, তার পাশেই গাজীপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিস কর্তৃক নোটিস ঝোলানো রয়েছে। সেখানে লেখাÑ ‘মহামান্য হাইকোর্টের রিট পিটিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী এই এলাকায় বালু ভরাট, অবৈধ দখল এবং সাইনবোর্ড টাঙানো বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলো। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেপান্তর ও নর্থ সাউথ গ্রুপ নামের প্রতিষ্ঠান দুটি কয়েক বছর ধরেই বেশি দামের লোভ দেখিয়ে বেলাই বিলের জমি কিনছে। তারা জমির কিছু টাকা বায়না করে, পরে আর টাকা না দিয়েই শুরু করে ভরাট। এতে জমির মালিকেরা প্রতিবাদ করলেও কাজ হচ্ছে না। তাদের এসব প্রতিষ্ঠানের হয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ। এভাবে প্রায় ৪০ বিঘা জমি এলাকাবাসীর নিকট থেকে নিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। কিছু দিন আগে প্রশাসনের তৎপরতায় ভরাট বন্ধ ছিল। এখন রাতের আঁধারে চলে ভরাটের কাজ।
দড়িপাড়া গ্রামের বাসিন্দা গার্বিয়েল বলেন, ‘৪-৫ বছর আগে আমার চার বিঘা জমি ১ কোটি টাকা দাম বলে কিনে নেয়। পরে আমাকে ২২ লাখ টাকা দিয়ে ভরাট করে। এখন পর্যন্ত বাকি টাকা দেয়নি। টাকা চাইলে নানা টালবাহানা করে। জমির দলিল এখনও হয়নি।’
নলছাটা গ্রামের বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র বলেন, ‘এ বিলে ১০-১২ বিঘা জমি আছে। বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠান এ জমি কিনতে চেয়েছে। বিক্রির জন্য আমাকে নানাভাবে হুমকিও দিয়েছে। বিক্রি না করেও ঝামেলায় আছি, কারণ এসব জমি একফসলি। বর্ষা চলে গেলেই ফসল লাগানো হয়, কিন্তু ভরাট করায় পানি বিল থেকে নামতে দুই মাসেরও বেশি সময় লাগে। তাই সময়মতো ফসল ফলাতে পারি না, ফলনও কম হয়।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওই এলাকায় আবাসন প্রতিষ্ঠান দুটির কাউকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া স্থানীয়দের কেউ যোগাযোগের কোনো নম্বর দিতে পারেননি।
জানতে চাইলে গাজীপুর সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাফে মোহাম্মদ ছড়া বলেন, ‘১৯ আগস্ট ভরাট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কাজ চলমান থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ নোটিস দেওয়ার পর আবাসন প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি বলেও জানান তিনি।