নিরাপদ পানি সরবরাহ
সাদিকুর রহমান সামু, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ০০:৪২ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৩ ১৪:৩১ পিএম
ট্যাংক তৈরির কলামের অর্ধেক করেই কাজ বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ছবিটি কমলগঞ্জের সদর ইউপির সরইবাড়ির মোহাম্মদ আলীর বাড়ি থেকে তোলা। প্রবা ফটো
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকল্পের কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করছে। ৯ মাসের কাজ দেড় বছরেও শেষ হয়নি।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জে কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের অধীনে ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৮০টি পরিবারের জন্য ১৮টি স্থানে গভীর নলকূপ স্থাপনের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮৫ লাখ টাকা। প্রক্রিয়া শেষে মৌলভীবাজারের ইউসুফ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। কার্যাদেশ দেওয়ার পর গত বছরের ৫ জানুয়ারি তারা কাজ শুরু করে। ৯ মাস মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা গত বছরের ৫ সেপ্টেম্বর।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৯টি স্থানে কাজ শুরু করলেও মাত্র ২টি স্থানে পানি সরবরাহ চালু হয়েছে। এতদিনে পুরো প্রকল্পের মাত্র ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই নলকূপ স্থাপন, পানির ট্যাংক নির্মাণ, প্ল্যাটফর্ম তৈরি ও পানির লাইন সংযোগে করা হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম। প্রকল্পের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের ইট, পাইপ, রড ও সিমেন্ট। পানির ট্যাংক তৈরির কলামের পিলারে অনেক স্থানে ৮টি রডের স্থলে ব্যবহার হয়েছে ৪-৬টি রড।
গভীর নলকূপ বসাতে বোরিংয়েও নেওয়া হয় অনিয়মের আশ্রয়। ৭০০ ফুট গভীরতা থাকার কথা থাকলেও মাত্র ৪০০-৫০০ ফুট গভীরতায় বসানো হয়েছে নলকূপ। মাটি থেকে ৬-৭ ফুট গভীরে ফাউন্ডেশন দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো স্থানে মাত্র ২-৩ ফুট নিচে করা হয়েছে। পানির ট্যাংকের ওপরের স্লাবের প্রোটেকশন দেয়াল পাঁচ ইঞ্চি হওয়ার কথা থাকলেও তা তিন ইঞ্চি করা হয়েছে।
ঘরে ঘরে পানি সংযোগ দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম প্লাস্টারবিহীন নির্মাণের পাশাপাশি ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের পাইপ, দেওয়া হয়নি ৩ ইঞ্চি সিসি ঢালাই। নামমাত্র কাজের ফলে হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন স্থানে ভেঙে ফাটল দেখা দিয়েছে প্ল্যাটফর্মে।
সরেজমিনে উপজেলার সদর ইউনিয়নের সরইবাড়ি এলাকার মামদ মিয়ার বাড়িতে দেখা যায়, গভীর নলকূপ স্থাপন না করেই পানির ট্যাংকের কলামের অর্ধেক করে রাখা হয়েছে। কাজ বন্ধ থাকায় রডে মরিচা ধরেছে, ইট ও খোয়াও বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেছে। মামদ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘বছরখানেক আগে শুরু হওয়া কাজটি ভালো হচ্ছে না। রড, সিমেন্ট কম দেওয়া হয়েছে। গত ৬ মাস ধরে কাজ বন্ধ আছে। কেউ এসে খোঁজ নেয়নি।’
শমসেরনগরের কৃষ্ণপুর গ্রামের খালিক মিয়ার বাড়ির উপকারভোগী আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমাদের এখানের কাজের মান খুব খারাপ। ট্যাংকে যেভাবে পলেস্তারা দেওয়া হয়েছে, বাড়ির মহিলারা তার চেয়েও ভালো মাটি দিয়ে ঘর লেপতে পারে।’
এদিকে আলীনগর ও মুন্সীবাজারে কাজ শেষ হলেও পাইপ লিকেজের ফলে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপকারভোগীরা। আলীনগরের দিশারী আশ্রয়ণ এলাকায় ২০টি পরিবারের জন্য দুটি গভীর নলকূপ বরাদ্দ হলেও সংযোগ দেওয়া হয়েছে একটিতে। অন্যটি শুধু পানির ট্যাংক তৈরির কলামের পিলারে কাজ হয়েছে। সেখানেও হয়েছে অনিয়ম। অসমাপ্ত পানির ট্যাংকটি হেলে পড়েছে। উপকারভোগী সুমন্ত মালাকার ও পিযুষ দেব অভিযোগ করে বলেন, ‘এখানের পানির লাইনের পাইপ, রড, প্ল্যাটফর্ম, সিমেন্টসহ সব ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে। কিছুদিন আগে সংযোগ দেওয়া হলেও, এখনই পাইপ লিকেজ হয়ে গেছে। কোনো ধরনের রঙ করা হয়নি পানির ট্যাংকে। পানি পেতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।’
একই অবস্থা মুন্সীবাজার ইউনিয়নের বাদে সোনাপুর জামেয়া নুরে মদিনা কওমিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা কমপ্লেক্সে। সেখানে পানির সংযোগ দেওয়া হলেও নিম্নমানের পাইপ হওয়ায় ফেটে লিকেজ হয়ে পানি বের হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন মাদ্রাসার সুপার রফিকুল হক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ইউসুফ আলীর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠালেও সারা পাওয়া যায়নি।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী সুজন আহমেদ বলেন, ‘১৮টি গভীর নলকূপের মধ্যে ৯টির কাজ শুরুই হয়নি। যেগুলোর কাজ চলছে তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের অভিযোগ কেউ করেনি। নিম্নমানের কাজের বিষয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জানতে চাইলে মৌলভীবাজার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ খালেদুজ্জামান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘সাইট যদি যথাসময়ে দেওয়া হতো, তাহলে কাজও দ্রুত শেষ হতো। জনপ্রতিনিধারা সাইট নির্ধারণ করেছেন।’ কাজে অনিয়মের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কাজ শেষ হলে আমরা ও গ্রাহকরা বুঝে নেব। কোনো কাজই সমাপ্ত হয়নি।’ আর কিছু জানতে চাইলে অফিসে আসেন বলে ফোন কেটে দেন তিনি।