দেবাশীষ দত্ত, কুষ্টিয়া
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৩ ১৪:১৮ পিএম
ঠিকাদারের অবহেলা, অপরিকল্পিত খনন আর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সুফল মিলছে না ঝুটিয়াডাঙ্গা-পাঙ্গাশিয়া নদী খননে। প্রবা ফটো
প্রাণ ফেরাতে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার মালিহাদ ইউনিয়নের আশাননগর গ্রামের ঝুটিয়াডাঙ্গা-পাঙ্গাশিয়া নদী খননের জন্য ২০২০ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেয় এলজিইডি। কিন্তু তা কাজে আসেনি। উল্টো যতটুকু পানি ছিল, প্রকল্পের কাজ শেষে সেটুকুও নেই। নদীর বড় অংশ এখন পানিশূন্য। এতে বিপাকে পড়েছে লাভের আশায় ১৭ লাখ টাকায় মাছ চাষের জন্য নদী ইজারা নেওয়া ২১ জেলে পরিবার।
তারা বলছে, ঠিকাদারের অবহেলা, অপরিকল্পিত খনন আর অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সুফল মিলছে না।
জেলেরা জানান, তাদের না জানিয়ে এলজিইডি প্রকল্প হাতে নেয়। আর যে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিনি কাজই জানেন না। তাই নদীর দুই পাশ খুঁড়ে পাড় তৈরি করা হয়েছে। মাঝে খনন না হওয়ায় তাদের কোনো কাজে আসছে না। পাড়ে মাটি ফেলায় বৃষ্টির পানি আগে নদীতে পড়লেও এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা জানান, কুমার নদের অংশে প্রায় ৪৪ একর ঝুটিয়াডাঙ্গা পাঙ্গাশিয়া নদীর জলকর রয়েছে। প্রতি বছর জেলা প্রশাসকের রাজস্ব শাখা থেকে জলকরটি মাছ চাষের জন্য মালিহাদ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি ইজারা নিয়ে আসছে। চলতি বছরও প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকায় জলকরটি ইজারা নেয় সমিতি। তবে জলকরের যে অংশে খনন করা হচ্ছে চার বছর ধরে সেখানে কোনো পানি নেই। পাশে ১৫ একরের মতো জলকরে অল্প পানি আছে। এলজিইডি অফিস ‘সারা দেশে পুকুর, খাল উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় কুমার নদের শাখা খাল পুনঃখনন ও খালের ঘাটে ঘাটলা নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় মিরপুর উপজেলা মিটন পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা রওশন আলীকে। কাজের মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত তিন বছর সব মিলিয়ে এক মাসের মতো খননকাজ করেছেন ঠিকাদার রওশন। এতদিনে শুধু ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছে নদীর পাড়ে।
জেলেরা বলেন, ‘হঠাৎ করে ২০২০ সালে নদী খনন করা হবে বলে ঠিকাদার ভেকু মেশিন নিয়ে আসেন। তখন নদীতে পানি ও মাছ ছিল। শীতের মধ্যে নদীর একটি অংশের মাথায় বাঁধ দিয়ে সব পানি সেচে ফেলা হয়। এরপর পানিশূন্য হয় নদী।’
মৎস্যজীবী শামীম আল হাসান বলেন, ‘নদীতে আমরা মাছ চাষ করি। ঠিকাদার ও এলজিইডির প্রকৌশলীরা আমাদের পরামর্শ না নিয়ে ইচ্ছামতো কোনো রকমে কাজ করেছেন। কোনো খননই হয়নি। চারটি বছর আমাদের হয়রানি করেছেন তারা। তাদের গাফিলতির কারণে আমরা এখন সর্বস্বান্ত হওয়ার পথে।’
ছানোয়ার হোসেন ও জাকির হোসেন নামে দুই ভুক্তভোগী বলেন, ‘বৈশাখের আগে আমরা ১৭ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছি। ২ লাখ টাকার বেশি জামানত পড়ে আছে। এখন বড় অংশে কোনো পানি নেই। মাছ চাষ তো দূরে থাক, গোসল করার মতো পানি নেই। ৬০ লাখ টাকার খননে যদি এই অবস্থা হয় তাহলে কিছু বলার নেই। সব টাকা প্রকৌশলী আর ঠিকাদার ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।’
মালিহাদ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আলাউদ্দিন মোল্লা বলেন, নদীতে পানি না থাকায় পাড়ে নৌকা পড়ে আছে। সেখানে ঘুণ ধরেছে। পচে যাচ্ছে নৌকার অংশ। জাল ফেলে রাখা হয়েছে পাড়ে। জেলেরা ধার-দেনা করে নদী ইজারা নিয়ে এখন বিপাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘এলজিইডির এই প্রকল্পে আমরা সর্বস্বান্ত। তাদের খনন হয়েছে ইচ্ছেমতো। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বারবার প্রকৌশলীদের ফোন দিলেও তারা এসে ঠিকাদারের কথা শুনেছে, আমাদের কোনো কথা রাখেনি। দুই বিঘার বেশি জমি বিক্রি করে নদী ইজারা নিয়েছি। এখন পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই। নদী খননের অনিয়মের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’
ঠিকাদার রওশন বলেন, ২০২০ সালে কাজের মেয়াদ শেষ লেখা থাকলেও পরে তা বাড়ানো হয়। চলতি বছর কাজ চূড়ান্ত শেষ হয়েছে। কী পরিমাণ মাটি উত্তোলন করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনে নেই। অভিযোগের বিষয়ে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে এ কাজের জন্য সব বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে এলজিইডির একটি সূত্র জানিয়েছে। নদী খননের বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে থাকায় একজন সহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলীর যোগসাজশে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে মিরপুর উপজেলা এলজিইডি অফিসে গেলে কথা বলতে রাজি হননি উপজেলা প্রকৌশলী রোশান আহমেদ। তিনি এক উপসহকারী প্রকৌশলীকে দেখিয়ে দেন কথা বলার জন্য। ওই উপসহকারী প্রকৌশলী সংবাদ না প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ জানান।