মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১৬:০৮ পিএম
আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৩ ১৭:৩৪ পিএম
বাঁশের দাম বৃদ্ধি ও সংসারের টানাপড়েনের মাঝে এখনও কিছু পরিবার এ পেশায় আঁকড়ে রেখেছে। ছবিটি তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামের পাটনীপাড়ার। প্রবা ফটো
বাড়ির উঠানে গাছতলায় বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষের কর্মব্যস্ততা। সারি সারি বাঁশ সাজানো। সেই বাঁশ মেপে কাটা ও বেতি তোলার কাজ চলছে সমানতালে। রঙিন বেতি দিয়ে নারীর শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় গড়ে তুলছেন ডোলা, খাঁচা, খাটি, ডালি, টুকরি, কুলা, পলাই, চাঁইসহ নানান বাঁশের সরঞ্জাম। সম্প্রতি এমন দৃশ্যই দেখা গেল তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামের পাটনীপাড়ায়।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী গৃহস্থালি নানা সরঞ্জাম যুগ যুগ ধরে তৈরি করে আসছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক পরিবারের নারী-পুরুষ। তারা বাঁশ-বেত শিল্পের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। বাঁশ দিয়ে তৈরি কবুতর কাবু, খই চালা, চাউলোন, ভাড়কা জোড়া, হাতপাখা, দাঁড়িপাল্লা, চাই, ভোড়ং, জলেঙ্গা ডেরু, পাড়া, ডোল খাঁচা, টুকরি ডালি, কুলা, পলাই, ঝুড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করেই চলে তাদের সংসার।
একসময় এই শিল্পের সঙ্গে কয়েকশ পরিবার জড়িত ছিল। গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত এসব সরঞ্জাম তৈরির জন্য গ্রামের মানুষের সকাল শুরু হতো বাঁশ কাটাসহ প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে এ শিল্প প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বাঁশের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, বিপরীতে বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিকের পণ্যের ছড়াছড়িতে দাম কমে গেছে। বাঁশের পণ্য তৈরির সেই চিরচেনা শব্দ এখন অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে গেছে। সংসারের টানাপড়েনের মাঝে অনেকে এ পেশা ছেড়েছেন। তবে এখনও কিছু পরিবার বাপ-দাদার এ পেশা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। এ শিল্পের দৈন্যদশায় ঘাড়ে চেপেছে ধার-দেনা ও এনজিওর ঋণ।
হাজারীহাট কালীবাড়ি সাহাপাড়ার জয় চন্দ্র হাজরা বলেন, ‘কয়েক বছর আগেও এসব সরঞ্জাম তৈরির জন্য এলাকায় অনেক বাঁশঝাড় ছিল। তখন ৪০-৫০ টাকায় একটি বাঁশ কেনা যেত। বাঁশঝাড় কমে গেছে, আর দামও বেড়েছে। একটি বাঁশের দাম এখন ১৫০-২০০ টাকা। কিন্তু সেই অনুপাতে বাঁশের তৈরি পণ্যের দাম বাড়েনি। বাঁশ দিয়ে একটি কুলা তৈরি করতে খরচ হয় ৫০ টাকা। অথচ বাজারে তা ৫০ টাকার বেশি বিক্রি করা যায় না।’
একই এলাকার বকুল চন্দ্র দাস বলেন, ‘বংশপরম্পরায় এই পেশা দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। সরকার করোনাকালীন সব পেশার মানুষকে সহযোগিতা করেছে, কিন্তু আমরা সেই সময় বঞ্চিত ছিলাম। বাপ-দাদার পেশায় এখন কোনোরকম টিকে আছি। সরকারের সহযোগিতা পেলে ভালো হতো।’
তারাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান লিটন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাঁশ ও বেত শিল্প গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্য ধরে রেখেছে তারাগঞ্জের কিছু পরিবার। এই শিল্পকে কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায় সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা এটির সঙ্গে জড়িত আছে তাদের সহযোগিতা করা হবে।’