সুবল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৩ ২২:১৩ পিএম
কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ী। সংগৃহীত ছবি
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, চট্রগ্রামে এবার আনুমানিক সাড়ে সাত লাখ পশু কোরবানি হয়েছে। যা গত বছরের চেয়ে ১০-১৫ শতাংশ কম। তাই চামড়া সংগ্রহও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়েছে। গতকাল শনিবার পর্যন্ত ৩ লাখ ১৯ হাজার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে বলে জানিয়েছে বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতি।
এদিকে গত কয়েক বছরে কাঁচা চামড়ার টানা দরপতনের কারণে মাঠপর্যায়ে চামড়া সংগ্রহের আগ্রহ কমেছে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। এ ছাড়াও গত বছরের মতো এবারও মৌসুমি সংগ্রহকারী-আড়তদার এবং তাদের প্রতিনিধি সিন্ডিকেটকে হটিয়ে দিয়েছে আনজুমান এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের অঙ্গসংগঠন গাউছিয়া কমিটি। তাদের তত্ত্বাবধানে শত শত মাদ্রাসার ছাত্র ট্রাক নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন অলিগলি ও গ্রাম থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছে। কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে তারা বিনা মূল্যে চামড়া পেয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে মহানগরীর কাঁচা চামড়া সংগ্রহের স্থানগুলো ঘুরে এবারও চিরচেনা দৃশ্যের দেখা মেলেনি। অলিগলির মুখে কিংবা সড়কে চামড়া নিয়ে তরুণ-যুবকদের জটলা ছিল না। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চৌমুহনী কর্ণফুলী বাজার, ঈদগাহ বৌবাজারসহ যেসব স্পটে কাঁচা চামড়া এনে জড়ো করা হতো, সেসব স্থানে তেমন ভিড়-হাঁকডাক চোখে পড়েনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কাঁচা চামড়ার বাজার প্রতিবছর একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত। সেই সিন্ডিকেট ২০২০ সাল থেকে ভেঙে যায়। ২০১৯ সালে আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিরা ‘অস্বাভাবিক দরপতন’ ঘটিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কেনা বন্ধ রেখেছিল। কাঁচা চামড়া সড়কে ফেলে দিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল। এর ফলে ২০২০ সালে মৌসুমি সংগ্রহকারীর সংখ্যা অর্ধেকেরও কমে নেমে আসে। ২০২১ সাল থেকে কাঁচা চামড়ার বাজারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আড়তদার ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে। কিন্তু ২০২২ সালে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও কেনাবেচার নিয়ন্ত্রণ নেয় গাউছিয়া কমিটি, যা অব্যাহত ছিল এবারও।
এবার ২৫ শাতাংশ পশু কোরবানি কম হয়েছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সাবেক সভাপতি মাহবুব আলম। তিনি বলেন, ‘এ বছর ৪-৫ হাজার কাঁচা চামড়া সংগ্রহের টার্গেট নিয়েছিলাম। গড়ে ৫৫০ টাকা দামে সব মিলিয়ে তিন হাজারের মতো সংগ্রহ করেছি। একটি চামড়া লবণ দিয়ে আড়তে রেখে বিক্রি করা পর্যন্ত ৮০০ টাকার ওপরে খরচ পড়ে। এবার আড়ত আর শ্রমিকের খরচই উঠবে না, লোকসান হবে।’
এদিকে চট্টগ্রামে ছোট-বড় দুই শতাধিক আড়তে চামড়া সংরক্ষণ হয়। আড়তদার আছেন ৩৭ জন। অধিকাংশ আড়ত মহানগরীর আতুরার ডিপো এলাকায়। কোরবানির দিন জেলা ও মহানগর থেকে আসা চামড়া জমা হয় এই এলাকায়। ডিপোর বাইরে সড়কে লাখো চামড়ার হাতবদল হয়। হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটে।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এবার সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ কাঁচা চামড়া সংগ্রহের টার্গেট নিয়েছিলাম। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট, গরুর দাম বেশিসহ নানা কারণে এবার কোরবানি কম হয়েছে। এ ছাড়াও গাউছিয়া কমিটি ও বিভিন্ন মাদ্রাসা অনেক চামড়া সংগ্রহ করেছে। সরকার নির্ধারিত দামে গতকাল পর্যন্ত ৩ লাখ ১৯ হাজার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাউছিয়া কমিটি ও বিভিন্ন মাদ্রাসার কাছ থেকে আমরা ২১ হাজার চামড়া কিনেছি। তাদের কারণে চামড়া বেচাকেনায় শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, ‘এবার গরু-ছাগল মিলিয়ে মহানগরে ১ লাখ ৭০-৮০ হাজার কোরবানি হয়েছে। বর্জ্য সংগ্রহের অভিজ্ঞতা থেকে খুব একটা কম বলা যাবে না।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় চট্টগ্রামে প্রথমে ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭১৩ পশু কোরবানি হবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেটি কমিয়ে ৮ লাখ ৭৪ হাজারে নামিয়ে আনা হয়। গত বছর ৮ লাখ ১৩ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, ‘এবার ১০-১৫ শতাংশ কোরবানি কম হয়েছে। আনুমানিক সাড়ে সাত লাখ পশু কোরবানি করা হয়েছে। কয়েক দিন পর চূড়ান্ত হিসাব জানা যাবে।’