চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০২৩ ২৩:৫৮ পিএম
আপডেট : ১০ জুন ২০২৩ ১১:৩০ এএম
ছবি : সংগৃহীত
চট্টগ্রামের পূর্ব
মাদারবাড়ীর মোয়াজ্জেম হোসেন লাভলু বছর দুই আগে মুদি দোকান করতেন। করোনায় ব্যবসায় লোকসানের
মুখে সংসার চালাতে মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে যাত্রী পরিবহনকে বেছে নিয়েছিলেন
দেড় বছর আগে। বৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে বেশ চলছিল সংসার। অন্যদিনের মতো
বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে সল্টগোলা ক্রসিং এলাকায় রাস্তার পাশে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা
করছিলেন। কে জানত, এ অপেক্ষাই হবে শেষ অপেক্ষা। সেখানেই এক দুর্ঘটনায় কনটেইনার চাপা
পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন লাভলু।
বৃহস্পতিবার (৮ জুন) রাত ১০টার দিকে বন্দর
থানা এলাকার সল্টগোলা ক্রসিং মোড়ে তেলবাহী ওয়াগন ট্রেনের সঙ্গে কেমিক্যালবাহী লরির
সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষে লরি থেকে কনটেইনার খুলে পড়ে যায় রাস্তায়। আর ওই কনটেইনারের নিচে
চাপা পড়ে মারা যান লাভলু। কনটেইনারের নিচ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করতে লেগেছে আড়াই ঘণ্টা।
সিইপিজেড ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার
রায়হান আশরাফ বলেন, ‘কেমিক্যালবাহী একটি লরির বন্দর থেকে বের হওয়ার সময় সল্টগোলা ক্রসিং
মোড় এলাকায় ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে তেলবাহী ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে। খবর পেয়ে বন্দর
ও ইপিজেড ফায়ার স্টেশনের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। সংঘর্ষের ফলে লরির ওপর থাকা তেলের
ট্যাংকার বাঁ দিকে কাত হয়ে পড়ে। ওই কনটেইনারের নিচে চাপা পড়েন লাভলু। আমাদের কাছে উদ্ধার
করার ভারী সরঞ্জাম না থাকায় বন্দর কর্তৃপক্ষের সাহায্য চাওয়া হয়। পরে বন্দরের একটি
ক্রেন ঘটনাস্থলে এলে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।’
৩৮ বছর বয়সি লাভলু পূর্ব মাদারবাড়ীর আবদুল
গনি মিস্ত্রীর বাড়ির ডায়মন্ড ট্রান্সপোর্ট নামে একটি চার তলা ভবনের চতুর্থ তলার বাসিন্দা
ছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ তিনি। পৈতৃক ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাট ভাগে পেয়েছিলেন।
সেখানে বৃদ্ধা মা খোরশেদা বেগম, স্ত্রী জেসমিন আক্তার, নয় বছরের মেয়ে উমাইমা আনজুম
সিনহা, আর চার বছরের ছেলে লাব্বাইক মোয়াজ্জেমকে নিয়ে থাকতেন।
শুক্রবার বিকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের
আহাজারি। কথা হয় লাভলুর চাচাতো ভাই জাকির হোসেন রনির সঙ্গে। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে
তিনি বলেন, ‘মুদি ব্যবসায় লোকসানের পর মোটরসাইকেল চালানো শুরু করেছিলেন লাভলু ভাই।
আর কিছু রিকশা ছিল। এসব দিয়ে তার সংসার চলত। সম্পদ বলতে পৈতৃকসূত্রে পাওয়া এই ফ্ল্যাট
আছে। এর বাইরে কিছু নেই। হঠাৎ দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেল।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে চালকের দোষ যেমন ছিল
আমরা মনে করছি কনটেইনারও ঠিকভাবে বাঁধা হয়নি লরির সঙ্গে। এটা একটা হত্যাকাণ্ড। আমরা
এর বিচার চাই।’
সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল দুপুরের
দিকে লাশ পরিবারে হস্তান্তর করা হয়। সুরতহাল করেছেন চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক
আবু জাফর। তিনি বলেন, ‘কনটেইনারের চাপে লাভলুর তলপেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে গেছে।
মুখ কিছুটা থেঁতলে গেছে আর বাঁ হাত বাঁকানো ছিল। এ ঘটনায় লরিচালককে আসামি করে বেপরোয়া
গাড়ি চালিয়ে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছে। লরিটি আমাদের হেফাজতে আছে। তদন্ত চলছে।’
ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম
বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা তারেক মো. ইমরানকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে
রেল কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) আবিদুর রহমান বলেন, ‘দুর্ঘটনার
কারণ খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তাদের সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন
জমা দিতে বলা হয়েছে।’