মামুন-অর-রশিদ
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৩ ১০:০২ এএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৩ ১৩:২৩ পিএম
ফাইল ফটো
ভোলার গ্যাসক্ষেত্রে দুই ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স)। শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ এবং ইলিশা মিলিয়ে নতুন এ মজুদ নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার (১০ মে) জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বাপেক্সের পক্ষ থকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
বাপেক্স আশা করছে, পাইপলাইন নির্মাণ করা সম্ভব হলে এখান থেকে এখনই প্রতিদিন ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাবে। আরও পাঁচটি কূপ খননের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে।
মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ভোলার গ্যাস আনতে দ্রুত পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে সমীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়ে ইতোমধ্যে গ্রাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে সব কিছু চিন্তা করা হবে বলে জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।
‘ভোলার ইলিশা হতে পারে নতুন ক্ষেত্র’- সম্প্রতি প্রতিদিনের বাংলাদেশে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আগামী ১৫ মের মধ্যে এ বিষয়ে বাপেক্সের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। গতকাল ভোলা গ্যাসক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহম্মাদ আলী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে দেখা করেন।
মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই আলোচনায় ইলিশাকে নতুন ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি প্রতিমন্ত্রীকে নিশ্চিত করেছেন বাপেক্স এমডি। প্রতিমন্ত্রী ভোলার ইলিশায় গিয়ে নতুন এই ঘোষণা দেবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে এখনও দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। ইলিশাকে নতুন গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে চলতি মাসের যেকোনো দিন ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
বাপেক্স এমডি মোহাম্মদ আলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমরা মনে করছি ভোলায় মজুদ রয়েছে দুই টিসিএফ। ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা মিলিয়ে আমরা এই মজুদের ধারণা করছি। এখন পর্যন্ত বাপেক্স যতগুলো খনিতে তেল-গ্যাস উত্তোলন করছে, তার মধ্যে ভোলা সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। এর আগে ভোলায় দেড় টিসিএফ মজুদের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। নতুন করে ইলিশায় গ্যাস পাওয়ায় আরও আধা টিসিএফ মজুদ বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, এখন ভোলার শাহবাজপুর ক্ষেত্র থেকে দৈনিক ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু চাহিদা না থাকায় উত্তোলন করা হচ্ছে না। এর বাইরে আরও তিনটি নতুন কূপ খনন করা হয়েছে। এখান থেকে আরও ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট নতুন গ্যাস তোলা সম্ভব। সব মিলিয়ে আমরা জানিয়েছি এখান থেকে এখনই ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। তবে ভোলায় যেহেতু পাইপলাইন নেই, এ কারণে জিটিসিএলকে দ্রুত পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা জরিপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মোহাম্মদ আলী বলেন, ভোলায় আরও পাঁচটি নতুন কূপ খনন করা হবে। এটি হলে দৈনিক আরও ১০০ থেকে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, সব মিলিয়ে ভোলায় এখন পর্যন্ত ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। ৯টিতেই গ্যাস পাওয়া গেছে। এটিকে রেকর্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের অন্য কোনো খনিতে এমন ঘটনা ঘটেনি। এর আগে ভোলা নর্থে গ্যাস পাওয়ার পর ২০১৮ সালে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ঘোষণা করা হয়েছিল ভোলায় মোট গ্যাসের মজুদ রয়েছে দেড় টিসিএফ। এখন বাপেক্স বলছে, মজুদ বেড়ে দুই টিসিএফ হতে পারে।
ভোলার গ্যাস ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন সম্ভাবনা জেগেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বৃহত্তর খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ নেই। সরকার খুলনা পর্যন্ত ন্যাশনাল গ্রিড সম্প্রসারিত করলেও তা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রেই গ্যাস সরবরাহ করছে। ফলে এ অঞ্চলের শিল্প বিকাশ আগের মতোই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা পর্যন্ত গ্যাস আনা গেলে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যোগ করা সম্ভব। খুলনায় সরকার একটি ৮০০ মেগাওয়াটের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে। শুরুতে ভারত থেকে এলএনজি আমদানি করে কেন্দ্রের গ্যাসের চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা ছিল। পরে পেট্রোবাংলাই সেখানে গ্যাস সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে।
কিন্তু একটি ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে যে পরিমাণ গ্যসের প্রয়োজন হবে, সেখানে পাওয়া যাবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তবে ভোলা থেকে গ্যাস আনা সম্ভব হলে পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতির চালচিত্রই বদলে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক হোসেন মনসুর বলেন, দুই টিসিএফ অনেক গ্যাস। এটি আমাদের মূল ভূখণ্ডে আনা গেলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে কী পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাবে এবং পাইপলাইন নির্মাণে কী পরিমাণ খরচ হবে সেটি বিবেচনা করে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।