ঠাকুরগাঁও প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৩ ১৯:২৮ পিএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৩ ২০:৪২ পিএম
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন যুবলীগ নেতা আসাদুজ্জামান। প্রবা ফটো
ঠাকুরগাঁও জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান পুলককে থানার এনে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে। আসাদুজ্জামান ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রবিবার (৭ মে) তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, গত ২৯ এপ্রিল রাতে তাকে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় তুলে নিয়ে পুলিশ সদস্যরা বেধড়ক মারধর করেছে। নির্যাতনে তার হাত ভেঙে গেছে।
তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আসাদুজ্জামানকে কোনো নির্যাতন করেননি। বরং আটকের আগে স্থানীয় লোকজন আসাদুজ্জামানসহ আরেক যুবলীগ নেতাকে মারধর করেছে। তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে পুলিশ।’
এ ঘটনায় সদর থানার ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ৪ মে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জেলা যুবলীগের নেতারা। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান পুলিশ সুপার।
নির্যাতনের অভিযোগ তুলে আসাদুজ্জামান পুলক বলেন, ‘২৯ এপ্রিল রাতে পাবলিক ক্লাব মাঠের বৈশাখী মেলায় পুলিশ সঙ্গে এলাকার ছোটভাই ও জেলা যুবলীগের ক্রীড়া সম্পাদক খালিদ সিরাজ রকির টানাহেঁচড়ার ঘটনা শুনে ঘটনাস্থলে যাই। দেখি রকিকে গাড়িতে তুলছে পুলিশ, ওসি আছেন সেখানে। ওসির কাছে রকিকে আটকের কারণ জানতে চাই। এতে তিনি উত্তেজিত হয়ে আরও পুলিশ ডাকেন। পরিস্থিত খারাপ হলে আমি মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যেতে চাই। এ সময় পুলিশ সদস্যরা মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে নেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা আমাকে ধরে ফেলে। আমি ওসিকে বলি-নিজের অজান্তে যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে বা আপনি কষ্ট পেয়ে থাকেন ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কিন্তু তিনি কোনো কথাই শোনেননি। আমাকে পিকআপে তুলে থানায় নিয়ে যান।’
নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘থানায় ওসির রুমে নিয়ে আমাকে গালাগাল করে। একপর্যায়ে আমার চোখে গামছা বেঁধে ও হাতকড়া পরিয়ে লাঠি দিয়ে মারধর করতে থাকেন। একটি লাঠি ভেঙ্গে ফেলার পরে অন্য লাঠি দিয়ে ওসি ও পুলিশ সদস্যরা মারতে থাকেন। আমি নিস্তেজ হয়ে গেলে তারা মারা বন্ধ করেন। মারধরে আমর বাম হাত ভেঙ্গে যায়। রাত ৩টার দিকে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ভালোভাবে চিকিৎসা নিতে দেয়নি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেই তারা আবার থানায় নিয়ে আসে। পরদিন সকাল ৯টার দিকে আমাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। আমি ভাঙ্গা হাত নিয়েই জেলে থেকেছি। পরে জামিন পেয়ে গত ২ মে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখনও চিকিৎসা চলছে।’
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নাসরুল ইসলাম বলেন, ‘আসাদুজ্জামান পুলক গত ২ মে হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডের কেবিনে ফিজিক্যাল অ্যাসালড রোগী হিসেবে ভর্তি আছেন। তার বাম হাতের একটি হাড় ভেঙে গেছে এবং পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।’
আসাদুজ্জামানের মা আফরোজা বেগম বলেন, ‘বিনাদোষে আমার ছেলেকে মেলা থেকে নিয়ে রাত ১১টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত নির্যাতন করেছে ওসিসহ কয়েকজন পুলিশ। তাকে সদর হাসপাতালে নামমাত্র চিকিৎসা দিয়ে আবার থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আমার সেই অসুস্থ ছেলেকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। আমরা সামাজিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছি, এর বিচার চাই। বিচার না হলে ছেলের সঙ্গে যা হয়েছে আগামীতে অন্য কোনো মায়ের সন্তানের সঙ্গেও হতে পারে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি কামাল হোসেন বলেন, ‘২৯ এপ্রিল রাত সোয়া ১০টার দিয়ে বৈশাখী মেলা থেকে ফোন আসে, একদল যুবক মদ খেয়ে মেলায় নারীদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করছেন। পুলিশ পাঠালে ওই যুবকেরা সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় লোকজন আসাদুজ্জামান পুলক ও খালিদ সিরাজ রকি নামের দুজনকে আটক করেন। আটকের সময় স্থানীয় লোকজন তাদেরকে মারধর করেন। এতে তারা আহত হয়েছেন। পরে পুলিশ জানতে পারে আসাদুজ্জামান ও খালিদ সিরাজ যুবলীগ নেতা। সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়েছিল। ওই রাতেই জেলার যুবলীগ নেতারা থানায় এসে তাদেরকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদন জানান। তবে মেলা কর্তৃপক্ষ যেহেতু ওই দুজনকে পুলিশে সোপর্দ করেছে, তাই তাদের ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’
নির্যাতন ও হাত ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাতেই ছেড়ে দেইনি দেখে আসাদুজ্জামান পুলক আমার বিরুদ্ধে নির্যাতন ও হাত ভাঙে দেওয়ার অভিযোগ করছে। আসলে আমার অপরাধ হলো, পুলক নেতা মানুষ, তাকে কেন ছেড়ে দেওয়া হলো না। এই পুলকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, পুলিশকে লাঞ্ছিত করাসহ পাঁচটি মামলা রয়েছে। আর রকির বিরুদ্ধেও এমন নয়টি মামলা রয়েছে। এতগুলো মামলার আসামিকে কীভাবে ছেড়ে দেব। তাই তাদের আদালতে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
ওসির বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমি তো মেলার ভেতরই যাইনি। তাহলে কীভাবে নারীদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করলাম। মেলা আমাদের বাড়ির পেছনে হয়েছে, সবাই আমাকে চেনে। স্থানীয় লোকজন কেনই বা আমাকে পিটাবে, ওসি এটা মিথ্যা বলছে।’
২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত ঠাঁকুরগাও পাবলিক ক্লাব মাঠের বৈশাখী মেলার আয়োজন করে ‘আলপনা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সংসদ’ নামের একটি সংগঠন। মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল মজিদ আপেল বলেন, ‘আসাদুজ্জামান পুলক জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। সংগঠনের পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে সঠিক বিচারের জন্য পুলিশ সুপার ও রংপুরের ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।’
জানতে চাইলে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘জেলা যুবলীগের কাছ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।’