রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
রাজশাহী অফিস
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৩ ১৫:৪৫ পিএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৩ ১৭:২১ পিএম
মো. ইসমাঈল হোসেন।
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার এবং উপাচার্যের ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) মো. ইসমাঈল হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষাগত যোগ্যতার জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে আসা তার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিবিএ সার্টিফিকেট যাচাই করে এমন তথ্য মিলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বরের বিপরীতে শিক্ষার্থীর নাম ঠিক থাকলেও জন্মতারিখ ও তার বাবার নামে মিল পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সূত্র জানায়, লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার ইসমাঈল হোসেনের জাল সার্টিফিকেটসহ তার নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) সচিব ২০২১ সালে রামেবির উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। ওই চিঠিতে ইসমাঈল হোসেন জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চাকরি করছেন বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রাসিক কর্তৃপক্ষ।
ইসমাঈল হোসেনের দেওয়া তথ্যমতে, তিনি রাজশাহী থেকে ২০১১ সালে এসএসসি ও ২০১৩ সালে এইচএসসির পর ঢাকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্টামফোর্ড থেকে বিবিএ এবং সেই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে ইভিনিং কোর্সে এমবিএ সম্পন্ন করেন।
ইসমাঈল হোসেন প্রথমে রামেবিতে পিও কাম কম্পিউটার অপারেটর (১০ম গ্রেড) হিসেবে নিয়োগ পান। চাকরির পরের বছরই তিনি লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার (৯ম গ্রেড) হিসেবে আবেদন করেন। তৎকালীন ভিসির সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগ পান। এরপর ইসমাঈল রাতারাতি রামেবি ভিসির পিএস হয়ে যান। গুরুত্বপূর্ণ এই পদটির অপব্যবহার করে তিনি রামেবির আওতাধীন বিভিন্ন নার্সিং ও মেডিকেল কলেজ থেকে লাখ লাখ টাকা বাগিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন কর্মকর্তারা। তবে এসব বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাইছে না। ইসমাঈল ভিসির কাছের মানুষ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

এদিকে রাসিক সচিবের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালে রামেবির তৎকালীন রেজিস্ট্রার ড. মো. খালেদ স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বরাবর ইসমাঈলের সার্টিফিকেট তদন্তের জন্য চিঠি পাঠান। যেখানে ইসমাঈলের নাম ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তার রেজিস্ট্রেশন আইডি এবং পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখ করে যাচাই করতে বলা হয়। তবে সেই চিঠিতে ইসমাঈলের জন্মতারিখ, বাবার নাম ও ঠিকানার বিষয়ে কোনো কিছুই জানতে চাওয়া হয়নি।
রামেবির রেজিস্ট্রারের সেই চিঠি পাঠানোর ১৯ দিন পর স্টামফোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ইসমাঈল হোসেনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর, সিজিপিএ নম্বর উল্লেখসহ পাসের সার্টিফিকেটটি ঠিক আছে উল্লেখ করে চিঠি পাঠান।
তবে ইসমাঈলের স্টামফোর্ডের সার্টিফিকেটের বিষয়টি অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে ভিন্ন তথ্য। তার নিজের ভোটার আইডিকার্ডসহ স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যে রেজিস্ট্রেশন আইডিটি নম্বরের বিপরীতে সার্টিফিকেটটি জমা দিয়ে রামেবিতে নিয়োগ পেয়েছেন, সেই আইডির মূল শিক্ষার্থীর নাম মো. ইসমাইল হোসেন হলেও তার জন্মতারিখ ও বাবার নাম সম্পূর্ণ আলাদা।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বিবিএ ০৪৮ ১৫০৪৫ রেজিস্ট্রেশনের শিক্ষার্থী মো. ইসমাইল হোসেনের জন্মতারিখ ১৭ নভেম্বর ১৯৯৩ এবং তার বাবার নাম মো. আব্দুর রাজ্জাক মিয়া। অথচ রামেবির মো. ইসমাঈল হোসেনের ভোটার আইডি ও অন্য সনদ অনুসারে তার জন্মতারিখ ৩ অক্টোবর ১৯৯৫ এবং বাবার নাম শাহজাহান আলী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রামেবির একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, নামের সঙ্গে মিল রেখে প্রকৃত শিক্ষার্থীর আইডি ব্যবহার করে জাল সার্টিফিকেট তৈরি করে রামেবিতে দেওয়া হয়েছে এবং এই সার্টিফিকেটের ভিত্তিতে ইসমাঈল হোসেন কর্মরত আছেন।
রামেবির লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার এবং ভিসির পিএস মো. ইসমাঈল হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। এর আগেও একাধিকবার এ বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম মেলেনি।’
এ বিষয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ আছে। খুললে যাচাই করে এ বিষয়ে বিস্তারিত ও সত্যটা বলা যাবে।
রামেবির রেজিস্ট্রার প্রফেসর ডা. মো. আনোয়ারুল কবির এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করে ভিসির দপ্তর থেকে জারি করা বিবৃতি দিয়ে বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী রামেবি কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হলে একাডেমিক কার্যক্রম ব্যতীত কোনো বিবৃতি সংবাদমাধ্যমে দিতে পারবেন না।
ভিসি ডা. এ জেড এম মোস্তাক হোসেন তুহিন বলেন, ‘আমি ভিসি হিসেবে যোগদানের আগে লিয়াজোঁ ও প্রটোকল অফিসার এবং ভিসির পিএস মো. ইসমাঈল হোসেনের নিয়োগ হয়েছে। তার সার্টিফিকেট তদন্তের বিষয়টিও আমার যোগদানের আগের ঘটনা। আমাকে আগে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে ও জানতে হবে। সার্টিফিকেটের বিষয়টি প্রয়োজনে আবারও তদন্ত করা যেতে পারে।’