শেরপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৩ ১২:২২ পিএম
নানান পণ্য রোদে শুকাচ্ছেন এক মৃৎশিল্পী। প্রবা ফটো
দরজায় কড়া নাড়ছে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের উৎসব পয়লা বৈশাখ। উৎসব সামনে রেখে শেরপুরের মৃৎশিল্পীরা বাহারি রঙের খেলনা ও গৃহস্থালি পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত।
তারা জানান, একসময় জমজমাট থাকলেও প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় কদর কমেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের। পাশাপাশি কাজের সঠিক মূল্য না পাওয়া ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দিন দিন হারাতে বসেছে এই শিল্পটি। সব মিলিয়ে মৃৎশিল্পের দুর্দিন যাচ্ছে। জেলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প ধরে রাখতে নানা উদ্যোগের কথা জানায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।
শহরের পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চাশোর্ধ্ব কেঞ্চন রানী পাল মনের মাধুরী মিশিয়ে তৈরি করছেন বিভিন্ন রঙের ফুলের টব, মাটির ব্যাংক, পাতিল, সানকি ও বাচ্চাদের হাঁড়িপাতিল।
আসছে বৈশাখ উপলক্ষে এগুলোর ফরমায়েশ পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩৫ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। আগে মাটির তৈরি পাতিল, ঢাকনা, জলকান্দা, ফুলদানি, কলস, পুতুলসহ বিভিন্ন খেলনা বানাতাম। সারা বছরই ব্যস্ততা থাকত, কাজের চাপে ভাত খাওয়ারও সময় পেতাম না। তেমন ব্যবস্থা এখন আর নেই। তবে বৈশাখ মাস ঘিরে কিছুটা কাজের চাপ রয়েছে।’
একই এলাকার চেতন চন্দ্র পাল বলেন, ‘বাপদাদার পেশা হিসেবে ধরে রেখেছি এ শিল্পকে। এখন আর আগের মতো লাভ হয় না, পাইকারদেরও চাহিদা নেই। মাটির দাম অনেক বাড়ছে। পোড়ানোর ভুসি আগে ১০০ টাকা বস্তা কিনতাম, এখন ২০০ টাকায় নিতে হয়। খড়ের দামও বেড়ে গেছে। কারিগরদের মজুরিও দিগুণ দিতে হয়। সব মিলিয়ে এখন আর লাভ থাকে না। তাই ছেলেপেলেরা এসব কাজ করে না। তারা গাড়ির ড্রাইভার, রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ওয়ার্কশপে কাজ করছে।’
ঊয়রা এলাকার সুধা রানী পাল জানান, একটা সময় ঘর সাজানো কিংবা রান্নার কাজে প্রধান সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হতো বাহারি নকশার মাটির জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে কদর হারিয়েছে এই শিল্পের। প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের সঙ্গে তাল না মেলাতে পেরে এখন বাজার হারিয়েছে মাটির জিনিসপত্র। তবে বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে কিছুটা ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
উদ্যোক্তা কমিউনিটি শেরপুরের সমন্বয়ক মহিউদ্দিন সোহেল বলেন, একসময় বাঁশ, বেত এবং মাটির তৈরি সামগ্রীর খুবই কদর ছিল। বাঙালিদের ঐতিহ্যের ধারক এসব জিনিসপত্র এখন দৈনন্দিন জীবনে শখের জোগান দিচ্ছে। প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্য জায়গা দখল করে নিয়েছে। তাই মৃৎশিল্প এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এখনও এই শিল্পে কাজ করছে জেলার কয়েকশ পরিবার। পরিবেশবান্ধব এই শিল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারের সহযোগিতা। সারা বছর এ ব্যবসায় মন্দা থাকলেও বৈশাখীমেলায় বেশি পণ্য বিক্রি করে লাভ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা এই উদ্যোক্তার।
জেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা লুতফুন কবির বলেন, ‘মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগ নারী। তাদের আর্থিক সহযোগিতার সুযোগ আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে দেখব, কীভাবে সহযোগিতা করা যায়।’
জানতে চাইলে জেলা বিসিক কর্মকর্তা বিজয় কুমার দত্ত বলেন, মৃৎশিল্প আবহমান গ্রাম-বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। একসময় জেলায় সহস্রাধিক শিল্পী এ পেশায় জড়িত ছিলেন। নানা কারণে তা কমে এখন তিন শতাধিক হয়েছে। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেকোনো পরামর্শ ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে তাদের সহায়তা করা হবে।