এস এম রানা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৩ ০৮:২৪ এএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৩ ০৮:২৬ এএম
বান্দরবানের পাহাড়জুড়ে এখন সুবজের প্লাবন। চৈত্র মাস শেষ না হতেই পুরোনো পাতা বিসর্জন দিয়ে গাছেরা সেজেছে নতুন পত্রপল্লবে। এর মধ্যে চলছে চৈত্রসংক্রান্তি উৎসব পালনের প্রস্তুতি।
পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসবের সম্মিলিত আয়োজন বৈসাবিও সন্নিকটে। এমন আনন্দমুখর পরিবেশ হঠাৎ গুমোট হয়ে গেল রক্তের বন্যায়। আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে ফের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়াল পাহাড়ি দুই সংগঠন। গোলাগুলিতে ঝরে গেল আটটি তাজা প্রাণ।
বান্দরবান জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টার পর থেকে শুক্রবার দুপুর ১টা পর্যন্ত পাহাড়ে দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতে নিহতের এ ঘটনা ঘটেছে। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি থানা থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে খামতাংপাড়া এলাকায় রুমা সড়কের পাশে এ ঘটনা ঘটে।
গতকাল রাত ১০টা পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে নিহতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে পুলিশের একটি সূত্র বলছে, নিহত সবাই সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে আসা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ (কুকিচিং) নামক সংগঠনের সদস্য। অর্থের বিনিময়ে পাহাড়ে ঘাঁটি বানিয়ে জঙ্গি ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ আছে সংগঠনটির বিরুদ্ধে। ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) গণতান্ত্রিক নামে পরিচিত অংশটির সঙ্গে কেএনএফের বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেএনএফের বিভিন্ন পেজ থেকে তাদের সংগঠনের সাতজন নিহত হয়েছেন বলে প্রচার করা হচ্ছে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন- ভান দু বম, সাং খুম, সান ফির থাং বম, বয় রেম বম, জাহিম বম, লাল লিয়ান ঙাক বম ও লাল ঠা জার বম। এদের মধ্যে প্রথম ছয়জন জুরভারাংপাড়া ও একজন পানখিয়াংপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, গতকাল বেলা পৌনে ১১টায় রোয়াংছড়ি সেনা ক্যাম্পের কমান্ডার ও স্থানীয়দের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে খামতাংপাড়া এলাকায় মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এই সংবাদের ভিত্তিতে সেনাবাহিনীর সহায়তায় ঘটনাস্থলে গিয়ে সেনাবাহিনীর সদৃশ পোশাক পরিহিত আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের বয়স ২৫-৩৫ বছরের মধ্যে।
মরদেহ উদ্ধারের পর সেগুলো ময়নাতদন্তের জন্য বান্দরবান সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। উদ্ধারকৃত মরদেহ শনাক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) অবহিত করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, কেএনএফ ও ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে নিহতের এ ঘটনা ঘটেছে। নিহতরা সবাই কেএনএফের সদস্য।
রোয়াংছড়ি থানার ওসি মো. আব্দুল মান্নান জানান, ঘটনাস্থল থেকে দুটি একনলা দেশি বন্দুক জব্দ করা হয়েছে। গতকাল রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় অভিযোগ জানাতে কেউ থানায় আসেননি।
এমন হত্যাকাণ্ড ঘটেনি আগে
এ ঘটনার জের ধরে উৎসবমুখর পাহাড়ে ফের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর বান্দরবানে একসঙ্গে আটজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেনি। ২০২০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) দুই পক্ষের (মূল অংশ ও সংস্কারপন্থি) মধ্যকার সংঘাতে ছয়জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিল। ২০২২ সালের ৫ মার্চ রুমা থানা এলাকায় এমএলপি মগ পার্টি (মগবাহিনী) নামক সংগঠনের সঙ্গে জেএসএসের (মূল) সংঘাতে একসঙ্গে চারজন নিহত হন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বান্দরবানে এখন একাধিক আঞ্চলিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এসব সংগঠনের মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আবার কোনো কোনো আঞ্চলিক সংগঠন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ফলে একসময়ের শান্ত বান্দরবান এখন অশান্তির জনপদে পরিণত হচ্ছে।
গতকালের ঘটনার পর আসন্ন উৎসবের আয়োজন ফেলে প্রাণ বাঁচাতে এলাকা ছেড়েছে খামতাংপাড়ার ৯০টি পরিবার। পার্শ্ববর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বান্দরবানের পর্যটন নিয়ে আবার অনিশ্চয়তা
সশস্ত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব সংঘাতের মূল কারণ বলা হয় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও ব্যক্তিপর্যায় থেকে চাঁদাবাজি। সেই সঙ্গে পর্যটনশিল্প ঘিরেও গোষ্ঠীগুলোর ব্যাপক চাঁদাবাজি চলে। এমন দ্বন্দ্বের মধ্যে কেএনএফ গোষ্ঠী আলাদা রাজ্য গঠনের স্বপ্নও দেখছে। কেএনএফ নিজেদের অর্থের প্রয়োজনে সমতল থেকে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের জন্য নিজদের ডেরা ভাড়া দেয়। আর জঙ্গি ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়। এই কেএনএফের নেতৃত্বে রয়েছেন নাথান বম।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঘিরে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিক থেকেই পর্যটন নগরী বান্দরবানের তিন উপজেলার পর্যটনশিল্পের দুয়ারে কপাট পড়ে। গতকালের হত্যাকাণ্ডের পর সেই কপাটের স্থায়িত্ব দীর্ঘায়িত হলো বলেই আশঙ্কা করছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। অথচ চৈত্র মাসের শেষে উৎসব, বর্ষবরণ কিংবা ঈদের পর পর্যটনশিল্প জমজমাট হওয়ার কথা ছিল। এসব কিছুতেই এখন ‘জল’ ঢেলে দিল গোষ্ঠীর সংঘাত। অবশ্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় প্রশাসন বছরের প্রথম প্রান্তিক থেকেই রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানছি উপজেলার পর্যটক যাতায়াত বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল।
ফের আলোচনায় কেএনএফ
খামতাংপাড়াকে বলা হয় কেএনএফের ঘাঁটি। সেই ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিল ইউপিডিএফ ও জেএসএস (সংস্কার)। যোগাযোগসহ সার্বিকভাবে কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া ছিল কেএনএফ। গোষ্ঠীগুলোর এমন দখলদারিত্বের প্রচেষ্টার মধ্যেই কেএনএফের আট সদস্য ‘অতিগুরুত্বপূর্ণ’ পাড়ায় খুন হলো। এর মধ্য দিয়ে কেএনএফ খামতাংপাড়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কারণ পাড়ার বাসিন্দারা ইতোমধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন। সেই পাড়ায় আত্মগোপনে থাকার সুযোগ কমেছে কেএনএফ সদস্যদের।
এর আগে বছরের প্রথম সংঘাতের ঘটনা শুরু করে কেএনএফ। ২৮ জানুয়ারি রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নে সেনাবাহিনীর টহলে গুলি চালায় কেএনএফ। আত্মরক্ষার্থে সেনাসদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। পরদিন ২৯ জানুয়ারি মুন্নায়েমপাড়া এলাকা থেকে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সদস্য বেনেট থাং ম্রো’র গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
১০ ফেব্রুয়ারি রুমা থানার দুর্গম এলাকায় লাল রাম বম ওরফে লাল রাম নামের একজনের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে রুমা পুলিশ। ১২ মার্চ কেএনএফের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। আহত হন দুই সেনাসদস্য।
২২ মার্চ রামথার পাড়া এলাকা থেকে থং চুল বম নামের একজন পাড়াপ্রধানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ শুক্রবার আটজন খুন হয়। সেই হিসেবে ২৯ জানুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৯ দিনে ১২ জন খুন হলো বান্দরবানে।
এর আগে ২০২২ সালে বান্দরবানে গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাতে খুন হয়েছিল ১৪ জন। অর্থাৎ ২০২২ সালে ১৪ খুনের ঘটনার বিপরীতে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত খুন হলো ১২ জন। এমন সংঘাত অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।