শেরপুর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৩৯ পিএম
আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:৫৩ পিএম
শফিকুর রহমান তার চাষ করা কালো মাছিতে খাবার দেওয়ার সময়। প্রবা ফটো
শেরপুরে প্রথমবারের মতো ‘ব্ল্যাক সোলজার
ফ্লাই’ বা কালো মাছি
বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে সফল হয়েছেন শফিকুর রহমান। তার সফলতা দেখে জেলার অনেকেই এ মাছি
চাষে আগ্রহী হয়েছেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কালো মাছি চাষে খামারিদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি
করতে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগও উদ্যোগ নিয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নিজের চাষ করা কালো মাছি
পোল্ট্রি খাদ্য হিসেবে খাওয়াচ্ছেন। প্রতিদিন তার খামার দেখতে আসেন জেলার অনেক মানুষ।
শফিকুর রহমান নকলা উপজেলার নারায়নখোলার চরবসন্তী গ্রামের সোরাতুজ্জামানের
ছেলে। নিজ উদ্যোগে তিনি কালো মাছির চাষ শুরু করেন। স্বল্পমূল্যের পুষ্টিকর পোল্ট্রি
খাদ্য কালো মাছি চাষ করে তিনি স্বপ্ন দেখছেন অধিক মুনাফার।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘ইউটিউবে ভিডিও দেখে কালো মাছি চাষ করার আগ্রহ জাগে। গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জে থেকে কালো মাছির বীজ সংগ্রহ করতে যাই। জুলফিকার আলী নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করি। ২০২১ সালের শেষের দিকে এক কেজি বীজ কিনে চাষ শুরু করি। মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যেই খামারে উৎপাদন শুরু হয়। দিন দিন বাড়তে থাকে সংখ্যা। তবে সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া যায় গ্রীষ্মকালে। নিত্যদিনের খাবারের ফেলে দেওয়া অংশ, পাকা কলা, পচা আলু, মাছ ও মুরগির নাড়িভুঁড়ি, গম ও ভুট্টার গুড়াসহ বিভিন্ন ধরনের পচনশীল দ্রব্য দেওয়া হয় খেতে।'
তিনি বলেন, ‘একটি পূর্ণ বয়স্ক কালো মাছি পাঁচ হাজার ডিম দেয়। মাত্র দশ গ্রাম ডিম থেকে অন্তত ৩০ কেজি লার্ভা পাওয়া যায়। ওইসব লার্ভা হাঁস, মুরগি ও মাছের জন্য খুবই উন্নত মানের খাবার। বর্তমানে তার খামারে মাছির লার্ভা ও মাতৃপোকা তৈরি হচ্ছে। আর এর উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক অনেক কম।’
শফিকুরের স্ত্রী জেসমিন আক্তার বলেন, ‘সংসারের পাশাপাশি
খামারে দুজনে একসঙ্গে কাজ করি। আমাদের দেশী মুরগির খামারও রয়েছে। এ মাছি মুরগির খাদ্য
হিসেবে ব্যবহার করে আমরা বেশ লাভবান হচ্ছি। মাছি খেয়ে মুরগিগুলো বড় ও স্বাস্থ্যবান
হচ্ছে। আর স্বাভাবিকের চেয়ে ডিমও দিচ্ছে বেশি। বিক্রির জন্য বড় পরিসরে চাষ শুরু
করেছি। সরকারের সহায়তা পেলে উপকৃত হতাম।’
স্থানীয় পোল্ট্রি খামারি নাহিদুর রহমান রিজন, মোশারফ হোসেন ও শিহাবউদ্দীন জানান, ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই খুব উচ্চ প্রোটিনযুক্ত ও অন্যান্য ভিটামিন এবং মিনারেল সমৃদ্ধ। আর শতভাগ প্রাকৃতিক। এরা রোগ বহন করে না। উল্টো ই-কোলাই, স্যালমোনেলা ও টক্সিনের মতো ভয়ংকর রোগকে ধ্বংস করে। এই মাছি উৎপাদন বা পালিত হয় পচনশীল যেকোনো পরিত্যক্ত বস্তু ও বর্জ্য থেকে। যা পরিবেশ ভালো রাখে ও এ থেকে জৈব সার উৎপাদন করে কৃষি জমিতে ব্যবহার করা যায়।
শেরপুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সাহানা
আখতার বলেন, ‘কালো মাছি থেকে মাছ পাবে পুষ্টিকর খাবার, এতে মাছের উৎপাদন বাড়বে। এ ছাড়া বাড়বে মাছ, মাংস
ও ডিমের উৎপাদনও। পাশাপাশি এর মূল থেকে উৎপাদিত
জৈবসার কৃষিজপণ্যের দ্বিগুণ উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। তাই এই পোকার উৎপাদন বাড়াতে
হবে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শেরপুরের নকলায়
এই মাছির চাষ করা হয়েছে। বাজারে প্রচলিত খাদ্যের চেয়ে এই খাদ্য অনেক বেশি মানসম্পন্ন
হওয়ায় মাছ ও মুরগির জন্য অনেক উপকারী। অল্প খরচে ছোট জায়গায় এটি চাষ করে লাভবান হওয়া
সম্ভব। তাদের কাজে সকল ধরনের সহায়তার করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘ কালো মাছি পরিবেশবান্ধব এবং কৃষকের
বন্ধু। শুষ্ক অবস্থায় এই পোকার লার্ভা থেকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আমিষ, ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ
স্নেহ এবং ২০ থেকে ২২ শতাংশ শর্করা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত পরিমাণে ফসফরাস, পটাশিয়াম,
ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও সোডিয়াম ওই পোকার
লার্ভাতে রয়েছে। পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা, পচনশীল ফলমূল, শাক সবজি, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা
এবং গৃহপালিত প্রাণীর মল ভক্ষণ করে পোকাটির লার্ভা। সেই লার্ভা মাছের বিকল্প খাবার
হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই পোকা জৈব আবর্জনার ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত ভক্ষণ করে হজম করে থাকে।
অবশিষ্ট অংশ বায়োডিজেল, প্রোটিন এবং কম্পোস্ট সারে রূপান্তরিত হয়।’
কালো মাছি নিয়ে ১১ বছর গবেষণা করে সাফলতা পেয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম।