আমিনুল ইসলাম মিঠু
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১০:৫৩ এএম
আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ২৩:৩৫ পিএম
জামদানি কারিগররা মনে করেন, শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ছাড়া উন্নত মানের আদি জামদানি তৈরি অসম্ভব। অথচ এখন আর সেই পানি পবিত্র নেই। তাদের মতে, এ এক অশনিসংকেত। প্রবা ফটো
একসময় ভোর হতে না হতেই শীতলক্ষ্যা নদী থেকে পানি নিয়ে আসতেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জামদানিপল্লীর তাঁতিরা। সেই পানিতে রান্না হতো দেশি আমনের ভাত। তা দিয়ে আবার তৈরি হতো সুতা প্রক্রিয়াজাত করার বিশেষ উপাদান। বিশেষ প্রক্রিয়াজাত সেই সুতা দিয়েই বোনা হতো ঐতিহ্যময় আদি জামদানি শাড়ি।
শীতলক্ষ্যার জল তাই পবিত্র জামদানি কারিগরদের কাছে। তারা মনে করেন, এ নদীর পানি ছাড়া উন্নত মানের আদি জামদানি তৈরি অসম্ভব। অথচ এখন আর সেই পানি পবিত্র নেই। তাদের মতে, এ এক অশনিসংকেত।
স্মৃতির পাতায় শীতলক্ষ্যার পানি
কথা হচ্ছিল বয়সি জামদানি কারিগরদের সঙ্গে। তারা বলছিলেন, দিনের প্রথম প্রহরে সূর্য ওঠার মুহূর্তে মাটির কলসে শীতলক্ষ্যার পানি সংগ্রহ করা হতো। প্রতিটি ভোরবেলা তাই এ নদীর কূল হয়ে উঠত জামদানিপল্লীর নারীদের মিলনমেলা। তাদের নিয়ে যাওয়া পানিতে রান্না করা হতো তিলবাজাল, কালামন, ধলা আমন, ভাটা আমন, খামা, কাতিবাজাল, বালামের মতো দেশি আমন চালের মাড়গালা ভাত। সেই গরম ভাত ঠান্ডা করে শিলপাটায় বেটে শীতলক্ষ্যার পানি মিশিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হতো সুতা। কিন্তু নদীর পানির গুণগত সেই মান এখন নেই। তাই এখন জামদানি বুনতে হচ্ছে আমদানি করা সুতায়। নদীর বদলে নলকূপের পানি এবং ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ধুয়ে এ সুতা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তাই হারিয়ে যেতে বসেছে আদি জামদানি। কারিগররা বলছেন, অথচ মাত্র ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও আদি জামদানি তৈরিতে শীতলক্ষ্যার পানির ওপরই নির্ভর করতেন তারা।
জামদানিশিল্পী ও বাংলাদেশ উইভার্স প্রোডাক্টস অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সালাউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আগে শীতলক্ষ্যার পানি ছিল একদম পরিষ্কার। আর এখন একেবারে রাবের (কালো ও ঘন পানি) মতো। দুর্গন্ধে নদীর সামনে যাওয়ার উপায় নেই। এ পানি দিয়ে আদি জামদানি শাড়ি হবে কেমন করে? তাই আমরা এখন নলকূপের পানি ফুটিয়ে খইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে সুতা তৈরির প্রক্রিয়া শেষ করি। আমার মনে হয়, আর কখনোই হয়তো আগের মতো নদীর পানি দিয়ে জামদানি শাড়ি বোনা যাবে না।’

দুই হাজার বছর আগে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে গড়ে ওঠে বিখ্যাত মসলিন শিল্প। কাপাসিয়া, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ ছিল এর উৎপাদন এলাকা ও বাণিজ্যকেন্দ্র। শীতলক্ষ্যার তীরবর্তী জমিতে উৎপাদিত কার্পাস তুলা থেকে তৈরি হতো মসলিন কাপড়। অনেক পরে দেশের সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজিও গড়ে ওঠে শীতলক্ষ্যার তীরে। একসময় নারায়ণগঞ্জকে বলা হতো ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’। ১৮৪৬ সালে এই শীতলক্ষ্যাকে কেন্দ্র করে ইংরেজি সাহিত্যিক রুমার গডেন লিখেছিলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য রিভার’। পরে ফরাসি চিত্রনির্মাতা জাঁ রোনোয়া এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। এতে উঠে আসে এ নদীর স্বচ্ছ জলরাশিসহ সার্বিক জীববৈচিত্র্য; যা আজও বিমোহিত করে বিশ্বকে।
তৈরি করা যাচ্ছে না বিশেষ মণ্ড
জামদানি গবেষকদের মতে, জনবসতিঘেঁষা শীতলক্ষ্যা নদীর ভোরের বাতাস, শিশির বিন্দু, স্থানীয় মাটির রসে পরিপুষ্ট দেশি ধানের খই, ভাতের মাড় সব মিলিয়ে এই অববাহিকার নারীরা তৈরি করতেন বিশেষ এক মণ্ড; যা দিয়ে তৈরি হতো জামদানি শাড়ি। শীতলক্ষ্যার অববাহিকার এই ‘ঢাকা’ বা ‘ঢাকাইয়া জামদানিকে অনেকেই বস্ত্রইতিহাসের সূক্ষ্মতম বিলুপ্ত কাপড় মসলিনের অনন্য উত্তরাধিকার বলে অভিহিত করে থাকেন। ঢাকা থেকে এই জামদানি তাঁত বস্ত্র আগ্রা-বুখারা-সমরখন্দসহ পশ্চিম এশিয়ার অনেক অঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী তাঁতবস্ত্র হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলার এই অনন্য নিদর্শন জামদানি শাড়ির আছে অনেক ধরনের নকশা ও বুননরীতি।
এ প্রসঙ্গে গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, ‘২০১৬ সালে দেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় জামদানি। আমাদের একেকটা নদী অববাহিকায় একেক কাপড় তৈরি হয়েছে। শীতলক্ষ্যা অববাহিকায় তৈরি হয়ে আসছে জামদানি। কারণ এই নদীর অববাহিকা ও পানির গুণাগুণ, উপকরণ অর্থাৎ জামদানির সুতার বিভিন্ন ধাপ প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এর সঙ্গে শীতলক্ষ্যা নদী অববাহিকার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু এখন সে বৈচিত্র্য হারিয়ে যেতে বসেছে। যে নদী এ দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, ঐতিহ্য-সংস্কৃতিতে অবদান রেখেছিল, তা এখন দূষণে মরতে বসেছে। এ কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আদি জামদানির। নদীর পানিকে বিশুদ্ধ করা না গেলে ভৌগোলিক নির্দেশক ও ঐতিহ্যের আদি জামদানি তৈরি করা আগামীতে কঠিন ও চ্যালেঞ্জ হবে।’

কী বলছে নদীরক্ষা কমিশন
সম্প্রতি জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের ৪৮ নদী সমীক্ষা প্রকল্পের আংশিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে শীতলক্ষ্যার বেহাল চিত্র। এতে বলা হয়েছে, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে রয়েছে ২৮২টি দূষণের উৎস। নদীর গতিপথেও আছে ৪৯০টি দূষণের স্থান। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা এবং পৌরসভাও চিহ্নিত করেছে ৯১টি দূষণ-উৎস। নদীতীরের ছোট-বড় ২২২টি শিল্পকারখানা ও বসতবাড়ির পাশাপাশি হাসপাতাল, আড়ত, ডায়িং ফ্যাক্টরি, পোল্ট্রি খামার এবং ইটভাটার কঠিন-তরল বর্জ্য ড্রেন ও পাইপের মাধ্যমে নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। বারবার অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ ও জরিমানা আদায় করেও বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের অভিমত
পরিব্শেবিদ ও নদী গবেষক মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘একসময় শীতলক্ষ্যার পানিকে ডাবের পানির সাথে তুলনা করা হতো। কিন্তু এখন তা ব্যবহারের অযোগ্য। ৪৮ নদীর সমীক্ষা করতে গিয়ে দেখেছি নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ইটিপি আছে। এরপরও তারা রাসায়নিক বর্জ্যমিশ্রিত পানি পরিশোধন না করেই নদীতে ফেলছে। অনেক কারখানা মাটির নিচ দিয়ে বিকল্প পাইপ বসিয়ে সরাসরি বর্জ্য ফেলছে। ঢাকার অপরিশোধিত পয়োবর্জ্যও শীতলক্ষ্যায় যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘কারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিক বর্জ্য নদীর উপযোগী করে পরিশোধন করতে হয়। এজন্য ইটিপি পরিচালনার জন্য রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিক খরচ বেশি হয় প্রতিষ্ঠানগুলোর। তাই খরচ কমাতে সরাসরি নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এসব কারণে শীতলক্ষ্যায় ৩৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে দশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে, কমছে জলজ উদ্ভিদ। ছড়াচ্ছে পানিবাহিত রোগ।’
নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘দখল ও দূষণে শীতলক্ষ্যা অস্তিত্ব সংকটে। ইটিপি ছাড়া তো কোনো শিল্পকারখানাই চালু রাখা সম্ভব না। অথচ দিনের পর দিন প্রতিষ্ঠানগুলো নদীকে দূষিত করে ব্যবসা করছে। তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তর কী করছে? প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত এ অধিদপ্তরটিকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়নি।’
এদিকে আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নদী দূষণ করছে জানিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে নিয়মিত দেখতে হবে, আইন অনুযায়ী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ইটিপি চালাচ্ছে কি না। পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে আইনের প্রয়োগে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।’ এ ছাড়া তিনি শীতলক্ষ্যার পানির গুণগত মান ঠিক রাখতে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।