দিনাজপুর সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ ০৯:২২ এএম
আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩ ১১:১৯ এএম
দিনাজপুরের মহারাজা স্কুলে মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। ছবি : সংগৃহীত
বছর ঘুরে আবার এলো সেই বেদনাবিধুর দিন। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি, সূর্য তখন অস্তগামী। ঠিক এই সময় অকস্মাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় দিনাজপুরের মহারাজা স্কুল। স্কুলের দ্বিতল ভবন গুঁড়িয়ে যায়। তখন গোটা আকাশ, স্কুলপ্রাঙ্গণ অন্ধকারে ঢেকে যায়। স্কুলের বিশাল এলাকা এবং এর চারপাশে নিহত আর আহত মানুষের পোড়া গন্ধে ভয়ংকর এলাকায় পরিণত হয় ট্রানজিট ক্যাম্প। এই অকস্মাৎ বিস্ফোরণ শুধু মহারাজা স্কুলপ্রাঙ্গণ নয়, গোটা দিনাজপুর শহরকে ভূমিকম্পের মতো কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
এর পর থেকে ৬ জানুয়ারি দিনাজপুরের মহারাজা স্কুল মাইন বিস্ফোরণ ট্র্যাজেডি দিবস। সেদিনের মাইন বিস্ফোরণে একসঙ্গে প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনা ৫ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন অনেকেই। ইতিহাসের পাতায় এটি একটি শোকাবহ দিন।
দিনাজপুর শহরের উত্তর বালুবাড়ী মহারাজা স্কুলে স্থাপন করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্প। বিজয় অর্জনের পর ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ক্যাম্পে এসে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ আশপাশ জেলার মুক্তিযোদ্ধারা একত্র হন। প্রায় ৮০০ মুক্তিযোদ্ধা মিলে মাইন অপসারণ করতে জড়ো হয়েছিলেন সেখানে।
ভোরে একসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধারা বেরিয়ে পড়তেন কোথায় পাক সেনাদের ফেলে যাওয়া, লুকিয়ে রাখা ও পুঁতে রাখা মাইন, অস্ত্র ও গোলাবারুদ আছে তার সন্ধানে। এসব মাইন, অস্ত্র, গোলাবারুদ সারা দিন সংগ্রহ করে সন্ধ্যার দিকে জমা করতেন মহারাজা স্কুলমাঠের দক্ষিণাংশে খনন করা বাংকারে।
বিজয়ের মাত্র ২০ দিন পর ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সব আনন্দ-উদ্দীপনা নিঃশেষ হয়ে যায় এক অকল্পনীয় দুর্ঘটনায়। অকস্মাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় মহারাজা স্কুল। ভয়াবহ সেই মাইন বিস্ফোরণে ৫ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আহত হন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা। পরে নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের সমাহিত করা হয় সদর উপজেলার চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে।
মাইন বিস্ফোরণে সেদিনের স্কুলভবনটিও ধ্বংস হয়ে যায়। সেদিনের বিস্ফোরণে ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। তবে ৫ শতাধিক বলে জানান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকরা। আহত এমন অনেকেই ছিলেন যাদের জ্ঞান ফিরেছিল ১০ থেকে ২০ দিন পর।
দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র ও ৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের সাবেক আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল হক ছুটু বলেন, ঘটনার সময় তিনি তার শহরের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। দুর্ঘটনার পর শহরের সর্বস্তরের মানুষ ঘটনাস্থলে গিয়ে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধার করে।
তিনি আরও বলেন, সেদিনের ওই মাইন বিস্ফোরণে শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নয়, শহরের উত্তর বালুবাড়ী কুমারপাড়া মহল্লায় আরও ১৫ জন মৃত্যুবরণ করেন।
দিনাজপুর সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে এত বড় ঘটনা আর একটিও নেই। নতুন প্রজন্মকে বিষয়টি জানানোর জন্য এ ঘটনাটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে ‘৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদ’। কিন্তু ৫১ বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের দাবি বাস্তবায়ন হয়নি।’
৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক সুলতান কামাল বলেন, ‘বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার। দিনাজপুরের এই মাইন বিস্ফোরণে যারা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এটা দিনাজপুরসহ সারা দেশের জন্য মর্মান্তিক ঘটনা। এ ইতিহাস আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।’
জাতীয় সংসদের হুইপ ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণস্থলে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হচ্ছে। আমার সহায়তায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত হচ্ছে এটি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।’