কয়রা (খুলনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৪ ঘণ্টা আগে
৪টি খুঁটি পুঁতে চারপাশ ও উপরে পলিথিন, নেট জাল, চটের বস্তা আর খড় দিয়ে তৈরি একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে নাতি-নাতনিসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন জরিনা খাতুন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের পাথরখালী খালের গোড়া এলাকা। প্রমত্তা শাকবাড়ীয়া নদীর এই পারে ওয়াপদা বেড়িবাঁধ, আর অন্য পারেই আদিগন্ত সুন্দরবন।
একদিকে হিংস্র বাঘ আর নোনা পানির প্রাত্যহিক লড়াই, অন্যদিকে নদীভাঙনে সব হারানো মানুষের বেঁচে থাকার চরম সংগ্রাম। এই দুইয়ের মাঝখানে ৪টি খুঁটি পুঁতে চারপাশ ও উপরে পলিথিন, নেট জাল, চটের বস্তা আর খড় দিয়ে তৈরি একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘর। এই এক চিলতে ভাঙা ঘরের ভেতরেই নাতি-নাতনিসহ পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ৬৮ বছর বয়সী বৃদ্ধা জরিনা খাতুন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ ও শাকবাড়ীয়া নদীর ক্রমাগত ভাঙনে জরিনা খাতুনের পৈতৃক ও স্বামীর ভিটেমাটি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে নিরুপায় হয়ে তিনি এই বেড়িবাঁধের সরকারি জায়গায় আশ্রয় নেন। এর মাঝেই চার-পাঁচ বছর আগে মারা যান তার স্বামী মকবুল শেখ, যিনি নদীতে মাছ ধরেই সংসার চালাতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে জরিনা খাতুনের পরিবার চরম সংকটে পড়ে।
বর্তমানে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তার নাতি। হিংস্র বাঘের ভয় উপেক্ষা করে সুন্দরবনের নদী ও খালের ওপর নির্ভর করে কোনোমতে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেন তিনি। তবে জুনের শুরু থেকে তিন মাসের জন্য সুন্দরবনে সব ধরনের প্রবেশাধিকার ও মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বর্তমানে তাদের আয়ের পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ।
নদী বা খালের লবণাক্ত পানিতে মাছ না মিললে প্রায়শই অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের। মাথা গোঁজার ঠাঁই ও উপার্জনের সংকটের পাশাপাশি এই পরিবারের জন্য আরেকটি বড় দুর্ভোগের নাম বিশুদ্ধ খাবার পানি। এলাকায় মিষ্টি জলের তীব্র সংকট থাকায় প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।
চোখে জল আর কণ্ঠে আকুলতা নিয়ে জরিনা খাতুন কয়রার বলেন, “সামনে বর্ষা চইলে আইলো রে বাবা! এই দলক(ঝড়)-তুফান শুরু হওয়ার আগে যদি কেউ দয়া করে দুটো টিন দিতো, তাহলি কয়ডা খুঁটি পুইতি কোনোমতে একটু মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতাম। এই বর্সার সময়ডা রাইতের বেলা একটু শান্তিতি ঘুমোতি পারতাম”।
নিজের ভাগ্যের উপর আফসোস করে তিনি বলেন, “পোড়া কপাল আমাগের, আবার তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ হয়ে গ্যাছে। ছাওয়ালডা গাঙে (নদীতে) যেয়ে জাল ফেলে, কোনদিন মাছ পায়, কোনদিন পায় না। স্বামীডাও মইরে গ্যাছে কত বছর, এহন এই ভাঙা ঘরে ছাওয়াল-পেল্যাপান নিয়ে কত কষ্টে যে দিন কাটাতিছি, তা আল্লাই জানে”।
তিনি জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর সরকারিভাবে তিনি কেবল নামমাত্র ‘বিধবা ভাতা’ পান, যা দিয়ে এই বাজারে ৫ জনের সংসার চালানো অসম্ভব।
উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য অশোক কুমার শীল বলেন, “আগে একটি এনজিওর গৃহনির্মাণ প্রকল্পে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করলেও নতুন জায়গায় তারা যেতে রাজি হননি। তবে পরবর্তীতে প্রশাসন বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে নতুন কোনো আবাসন প্রকল্প এলে এই অসহায় পরিবারটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসনের সর্বোচ্চ চেষ্টা আমাদের থাকবে”।
বনজ সম্পদ, মৎস্য ও জলজ প্রাণীর নিরাপদ প্রজনন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং বন্য প্রাণীর সুরক্ষার লক্ষে ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ এবং পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে বন বিভাগ। তিন মাস বন বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এই এলাকায় বসবাসকারি জেলে-মৌয়ালদের।