তৃতীয় পর্ব
ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা সড়কগুলো, প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন লাখো মানুষ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা মহাসড়কগুলো। প্রতিদিন চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন লাখো মানুষ। দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের অভাবে ধুলোয় আচ্ছন্ন জনজীবন। যাত্রীদের অন্তহীন দুর্দশা, দুর্ভোগের ভয়াবহতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতা নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চিত্র নিয়ে আজ তৃতীয় পর্ব ।
বিপন্ন সড়কে পদে পদে দীর্ঘশ্বাস
রাস্তা হওয়ার কথা ছিল সভ্যতার ধমনি, কিন্তু দেশের লাখো মানুষের কাছে তা এখন আক্ষরিক অর্থেই যন্ত্রণার শিরা। বছরের পর বছর অপেক্ষার প্রহর কাটে, কিন্তু রাস্তার কাদা শুকায় না, উল্টো গর্তগুলো কেবল গভীরই হয়। উন্নয়নের নামে বরাদ্দ হয় কোটি কোটি টাকা, অথচ কোথাও উদ্বোধনের আগেই সেতুতে ধস নামে, কোথাও দুর্নীতির প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ মানুষ কাদামাখা সড়কেই রোপণ করেন ধানের চারা। আবার কোথাও মুমূর্ষু রোগীকে কাঁধে নিয়ে ছুটতে হয় স্বজনদের। একদিকে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের চরম উদাসীনতা, অন্যদিকে প্রতিদিন পথে নেমে মৃত্যুঝুঁকি আর সীমাহীন দুর্ভোগÑ এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বেহাল সড়কের চিত্র যেন উন্নয়নের কঙ্কালসার রূপটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
উদ্বোধনের আগেই ধস, শঙ্কায় লোহাগাড়া জনপদ
চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চুনতি ফারেঙ্গা সড়কে ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি সেতুর উদ্বোধন এখনও হয়নি। কিন্তু এর আগেই সংযোগ সড়কে একাধিক স্থানে ধস নেমেছে। মাটি সংরক্ষণ ও ঢাল সুরক্ষায় গাফিলতির কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই এই বেহাল দশা। স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল বাহার রাজা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এমন নিম্নমানের কাজ জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়।’ কাজের এমন গাফিলতিতে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ। তবে ঠিকাদারের প্রতিনিধি আল আমিন ধসে পড়া অংশ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী হামিদ হোসেন আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ঠিকাদারের জামানত এখনও আটকে রাখা হয়েছে, ত্রুটি ঠিক করতে তারা বাধ্য।
রামগতিতে কাদামাখা সড়কে ধান রোপণ
পৌরসভা প্রতিষ্ঠার ২৬ বছর পার হলেও লক্ষ্মীপুরের রামগতির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তিযোদ্ধা সায়েদুল হক সড়কটি আজও পাকা হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুকাদা জমে যায়। দীর্ঘদিনের অবহেলায় দিশাহারা এলাকাবাসী শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রতিবাদস্বরূপ এই কাদাযুক্ত সড়কেই ধানের চারা রোপণ করেছেন। ছাত্রদল নেতা তৌহিদুল ইসলাম নয়ন ও বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম বলেন, পৌরসভার ভেতরের রাস্তার এমন জরাজীর্ণ দশা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না, এখানকার জনগণ চরম অবহেলার শিকার। কাউন্সিলর ফখরুল ইসলাম বাবলু বলেছেন, টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে, দ্রুতই কাজ শুরু হবে। রামগতি পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মাঠপর্যায়ে দ্রুত কাজ শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে তাগিদ দেওয়া হবে। সদ্য বদলি হওয়া ইউএনও নিলুফা ইয়াসমিন নিপা বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজয়নগরে ১৭ কিলোমিটার জুড়ে মারণফাঁদ
বিজয়নগর উপজেলাকে আখাউড়ার সঙ্গে যুক্ত করা চান্দুরা-সিঙ্গারবিল ১৭ কিলোমিটার প্রধান সড়কটি এখন আক্ষরিক অর্থেই মারণফাঁদ। সিঙ্গারবিল থেকে চম্পকনগর বাজার পর্যন্ত অংশে বড় বড় গর্তের কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা; আহত হচ্ছেন শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্করা। যাত্রীদের অভিযোগ, ৫-৬ বছর ধরে দুরবস্থা চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। উপজেলা প্রকৌশলী আশিকুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চম্পকনগর পর্যন্ত অংশের কাজ চলমান থাকলেও বাকি অংশের এখনও অনুমোদন মেলেনি; আগস্টে প্রাক্কলন জমা দেওয়া হবে।
খানাখন্দে নাকাল রামু-নাইক্ষ্যংছড়ির ৪ লাখ মানুষ
মাত্র ১২ ফুট চওড়া ১২ কিলোমিটারের রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কটি এখন কাদার ভাগাড়। বড় ট্রাক, বাস ও বিজিবির ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নিত্য যানজট আর দুর্ঘটনা এখানকার নৈমিত্তিক চিত্র। ট্রাকচালক আবদুল জব্বার বলেন, ‘ঝুঁকি নিয়েই গাড়ি চালাতে হয়।’ সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ আক্ষেপের সুরে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও সড়কটি সম্প্রসারণের ফাইল বন্দি হয়ে আছে।’ ১১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল ফয়জুল কবির বলেন, সড়ক সরু হওয়ায় সীমান্ত সুরক্ষায় বিঘ্ন ঘটছে। বান্দরবান সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম অবশ্য জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করার কাজ দ্রুত শুরু হবে।
চকরিয়ায় হাসপাতালে রোগী নিতে হয় কাঁধে করে
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে মরংঘোনা-শুকুরমারা খালপাড় কাঁচা সড়কটি অর্ধশতাব্দীতেও উন্নয়নের মুখ দেখেনি। বর্ষা এলে কাদা-পানিতে কয়েকটি গ্রাম আক্ষরিক অর্থেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সিয়াম ও মারিয়ার মতো শত শত শিশুর বই-খাতা নষ্ট হয় কাদায় পড়ে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা লেদু মিয়া বলেন, ‘জীবনে অনেক সরকার দেখলাম, কিন্তু রাস্তার ভাগ্য বদলাতে দেখলাম না।’ এখানে মুমূর্ষু রোগীদের হাসপাতালে নিতে এখনও মানুষের কাঁধই ভরসা। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ইফতেখার বকুল বলেছেন, সরকারি কোড নম্বর না থাকায় এতদিন কাজ হয়নি, এখন আবেদন করা হয়েছে। কোনাখালী ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সিনিয়র সহসভাপতি মুহাম্মদ হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এটি কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি হাজারো মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগের বিষয়। দ্রুত সড়কটি উন্নয়ন করা প্রয়োজন।’
টেকনাফে সেতু আছে সড়ক নেই
টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের জুম্মা পাড়ায় চলাচলের জন্য একটি সেতু থাকলেও সংযোগ সড়কটির কোনো অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। সামান্য বৃষ্টিতে এটি রাস্তা না খাল, তা বোঝার উপায় থাকে না। স্থানীয় পথচারী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘গাড়ি তো দূরের কথা, মানুষও ঠিকমতো হাঁটতে পারে না।’ মৎস্যজীবী নেতা আব্দুর রহমান একে ‘নির্বাচনী প্রতিহিংসা’ আখ্যা দিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই পথে রোগীদের হাসপাতালে নিতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হওয়ায় প্রায়শই জীবন সংশয় দেখা দেয়। অবশ্য দ্রুত কাজ চালুর আশ্বাস দিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন খোকন।
কুমিল্লায় অপরিকল্পিত যানজটে স্থবির জনজীবন
ভাঙাচোরা রাস্তা, জলাবদ্ধতা ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় স্থবির হয়ে পড়েছে কুমিল্লা নগরী। আলেখারচর-শাসনগাছা প্রবেশপথ থেকে শুরু করে রানীর বাজার, ঠাকুরপাড়া ও ইপিজেড সড়কের বিভিন্ন অংশে গর্ত আর কাদায় একাকার। স্থানীয় বাসিন্দা রিংকু দেব ও জেনিফার শারমিন জানান, সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যায়, হেঁটে চলাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। সাথে যুক্ত হয়েছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যাটারিচালিত রিকশার দৌরাত্ম্য ও অবৈধ পার্কিং। কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে মাস্টারপ্ল্যান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্পেটিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গলে ৪ কোটি টাকার প্রকল্পে বালুর বস্তা
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৪ কোটি ৫ লাখ টাকার কালিঘাট-হোসনাবাদ সড়ক নির্মাণে স্মরণকালের সবচেয়ে নির্লজ্জ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আরসিসি ঢালাইয়ে নিম্নমানের ভিটি বালু, ইটের খোয়া ও পুরনো গাইডওয়ালের ওপর বালুর বস্তা দিয়ে কাজ করছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন চা-শ্রমিক ও জনতা। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে হোসনাবাদ পান পুঞ্জির মন্ত্রী ওয়েল সুরং ও শ্রমিক জাফর আলী সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগ আনলেও ঠিকাদার মো. হাসানুজ্জামান দাবি করেছেন, তিনি সরকারের কাছ থেকে কেনা সেলবেজ বা পরিত্যক্ত ইট দিয়েই নিয়মমতো কাজ করছেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুর রাকিব এবং ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান জানিয়েছেন, সরেজমিনে তদন্ত করে নিম্নমানের সামগ্রী পেলে অপসারণ করা হবে এবং কাজে কোনো অনিয়ম পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনটি করতে সহায়তা করেছেন
ফাহিম শাহরিয়ার শাফাত, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম); এহসান রিয়াজ, রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর); মাহমুদ হাসান সুমন, বিজয়নগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া); সাইদুজ্জামান সাঈদ, রামু (কক্সবাজার); মোহাম্মদ ইউনুছ অভি, টেকনাফ; এম জাহেদ চৌধুরী, চকরিয়া (কক্সবাজার); দিলীপ মজুমদার, কুমিল্লা ও ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার