খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে শনিবার বিকালে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে হুঁশিয়ার দিয়ে বলেছেন, সরকার কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত করলে তাদের ছেড়ে কথা বলা হবে না।
তিনি বলেন, আধিপত্যবাদ রুখতে এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত আজ প্রস্তুত রয়েছে।
যুবসমাজসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণকে দেশের মর্যাদা রক্ষায় আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় এই নেতা।
খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে শনিবার বিকালে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের.দাবিতে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কর্ণেল (অব.) ড. অলি আহমদ এবং মাওলানা মামুনুল হক।
‘আমরা চাই না কোনো প্রতিবেশীর ঘুম ও শান্তি হারাম হোক’
জামায়াত আমির বলেন, সীমান্তে আজ নানা উসকানি দেওয়া হচ্ছে। পুশ-ইনের নামে একটি প্রতিবেশী দেশ তাদের নাগরিকদের আমাদের দেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে আমাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) যখন সীমান্তে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, দেশের জনগণ তখন তাদের ডান হাত তথা শক্তিতে পরিণত হয়। এই ডান হাত দেশের ২০ কোটি মানুষের, বলেন তিনি।
জামায়াত আমির স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, আমরা চাই না আমাদের কোনো প্রতিবেশীর ঘুম ও শান্তি হারাম হোক। একইভাবে কোনো প্রতিবেশী আমাদের দিকে কালো হাত বাড়াবে, সেটাও আমরা বরদাশত করব না।
তিনি হুঁশিয়ারি বলেন, যদি কেউ কালো হাত বাড়ায়, মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, সেই কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।
ডা. শফিকুর রহমান যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আগামী দিনের এই সম্ভাব্য বিপ্লব কোনো নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, কোনো গোষ্ঠী বা পরিবারের আত্মসম্মান বা স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয়।
জামায়াত আমির বলেন, এই বিপ্লব হবে কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত না করে পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সম্মান, ইজ্জত, শক্তি ও সাহস নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য।
এ সময় সুস্থ, দুর্নীতিমুক্ত, চক্রান্তমুক্ত, দলীয় প্রভাবমুক্ত এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে যুবসমাজকে এগিয়ে আসারও উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে যুবকদের পাশাপাশি বয়োবৃদ্ধদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যায়, আধিপত্যবাদ, চাটুকার, দুর্নীতিবাজ ও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বয়সের ব্যবধান ভুলে সবাইকে এক হয়ে লড়তে হবে।
‘ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে আওয়ামী লীগ’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, তারা মানুষকে বৈষম্যহীন সমাজ, সম্পদ লুণ্ঠন না করা, হত্যার রাজনীতি বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল।
তিনি বলেন, কিন্তু তারা (আওয়ামী লীগ) প্রতিটি ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে। রাষ্ট্রের সকল বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে মানুষ খুন ও পঙ্গু করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছিল আয়নাঘর।
তিনি আরও বলেন, ওই সময় ব্যাংক, বিমা ও শেয়ার মার্কেট লুণ্ঠন করে অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দম্ভের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যিনি বলতেন হাসিনা পালায় না, শেষ পর্যন্ত তাকে তীব্র জনস্রোতের মুখে অপমানজনকভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। দুপুরের ভাত খাওয়ার রিজিকটুকুও আল্লাহ তার জন্য রাখেননি।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছর যাদের সেবাদাসী হিসেবে কাজ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাদের কোলেই গিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন।
বিএনপির প্রতি সতর্কবার্তা জামায়াত আমিরের
বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে সতর্ক করে জামায়াত আমির বলেন, জনরায়কে সম্মান না করার পরিণতি কী হতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
তিনি দাবি করেন, দেশে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা বা গৃহযুদ্ধ তৈরি না হয়, সেই কারণে সব যন্ত্রণা বুকে চেপে অতীতের অনেক নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু একে কেউ দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবেন। জামায়াত কারো ‘বাপ-দাদার চক্রান্তকে’ পরোয়া করে না বলেও উল্লেখ করেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি কোনো ফয়সালা সংসদে না হয়, তবে যেখানে কথা বলতে ‘মাননীয় স্পিকার’ বলতে হয় না সেই পল্টনের মাঠ, বরিশালের মাঠ, চট্টগ্রামের মাঠ, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী কিংবা বগুড়ার মাঠ থেকে গণজাগরণ তৈরি হবে। আর সেই জাগরণী জনমতই সরকারে পরিণত হবে।
‘আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না’
জামায়াত আমির দলের শীর্ষ নেতাদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, আমাদের নেতৃবৃন্দ হকের পথে ফাঁসির তক্তায় দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আমাদের শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
জাতির প্রয়োজনে শাহজালাল ও শাহপরানের এই বাংলাদেশের জনগণও আজ সেই মুচকি হাসি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। আমরা সিংহের মতো লড়াই করে যাব, কিন্তু কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না বলেন তিনি।
সমাবেশে সম্মানিত অতিথি ছিলেন, এনসিপির মূখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদসহ আরও অনেকে।