কুড়িগ্রাম সীমান্ত
কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তের শূন্যরেখাই এখন আটকে থাকা ওই ৯ জনের ঠিকানা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় টানা পাঁচ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন নারী-শিশুসহ ৯ জন।
দুই দেশের কাঁটাতারের মাঝখানের কয়েক গজ ভূমি এখন তাদের জন্য এক অনিশ্চয়তার ঠিকানা।
মাথার ওপর নেই কোনো ছাউনি, নেই নিরাপদ আশ্রয়। দিনভর রোদের তাপ আর রাতের অন্ধকার পেরিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে উৎকণ্ঠা, ভয় আর ঘরে ফেরার আকুতিতে।
সীমান্তের সেই নির্জন শূন্যরেখায় গিয়ে দেখা যায়, মায়ের কোলে ঘুমিয়ে আছে এক অসুস্থ শিশু। পাশে বসে আছেন কয়েকজন নারী। তাদের চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, অনিশ্চয়তার ছায়া।
দুই সন্তানের জননী সুমি আক্তার কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, আমার ছোট ছোট দুইটা সন্তান। কয়েকদিন ধরেই খোলা আকাশের নিচে আছি। বৃষ্টি হইলে ভিজি, রোদ হইলে পুড়ি।
তিনি বলেন, “বাচ্চাগুলা অসুস্থ হইয়া পড়ছিল। চিকিৎসা পাওয়ার পর একটু ভালো আছে, কিন্তু এভাবে আর কতদিন থাকমু জানি না।
“আমার সন্তানগুলা বারবার বাড়ি যাওয়ার কথা বলে। আমরাও শুধু ঘরে ফিরতে চাই।”
একজন মায়ের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তার সন্তানের মুখে হাসি দেখা। অথচ সীমান্তের এই শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে সেই হাসিও যেন হারিয়ে গেছে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
একইভাবে আটকে থাকা হিমেল বলেন, “পাঁচ দিন হইয়া গেল। পরিবার থেকে দূরে আছি। মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন সবাই চিন্তায় আছে।
“আমরা কোনো ঝামেলা চাই না। শুধু চাই একটা সমাধান হোক। মানুষ হিসেবে একটু স্বাভাবিকভাবে বাঁচার সুযোগ চাই।”
জানা গেছে, গত ১৪ জুন আন্তর্জাতিক ১০৬০ মেইন পিলারের ১-এস সাব-পিলার এলাকায় কয়েকজন নাগরিককে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএেএফ।
এ সময় বিজিবি ও স্থানীয় জনতার বাধার মুখে তারা শূন্যরেখায় আটকে পড়েন।
একই দিনে ভন্দুচর সীমান্তেও আরও কয়েকজন একই পরিস্থিতির শিকার হন।
এরপর থেকে মোট ৯ জন নারী, পুরুষ ও শিশু সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুও। খোলা আকাশের নিচে দিনের পর দিন অবস্থান করায় শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে মানবিক বিবেচনায় বুধবার দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর যৌথ মেডিক্যাল টিম সেখানে গিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করে।
তবে চিকিৎসা মিললেও অনিশ্চয়তার অবসান হয়নি। চিকিৎসা শেষে আবারও একই জায়গায় ফিরে যেতে হয়েছে তাদের।
রাত নামলে খোলা মাঠের মধ্যে ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে বসে থাকতে হয়। দূরে জ্বলতে থাকা সীমান্ত চৌকির আলো ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো আলোর দিশা নেই।
এদিকে আটকে পড়া মানুষগুলোর কষ্ট দেখে পাশে দাঁড়িয়েছেন সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়রা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও পরিধেয় বস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছেন।
মানবিক এই উদ্যোগই এখন তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাসানুর রহমান বলেন, ‘শূন্যরেখায় অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিষয়টি অত্যন্ত মানবিকভাবে দেখা হচ্ছে। তাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি রাখা হচ্ছে।”
“একই সঙ্গে বিষয়টির দ্রুত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে, বলেন ওই কর্মকর্তা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, পাঁচ দিন ধরে নারী-শিশুসহ মানুষগুলোকে শূন্যরেখায় আটকে রাখা কোনোভাবেই মানবিক নয়। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে তাদের দুর্ভোগের অবসান ঘটানো উচিত।
রৌমারীর সীমান্তে কাঁটাতারের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে দুটি রাষ্ট্র। কিন্তু মাঝখানে আটকে থাকা ৯টি মানুষের কাছে এখন রাষ্ট্র, রাজনীতি কিংবা সীমান্তের হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন- ‘আর কতদিন?’