অরিত্র কুণ্ডু, ঝিনাইদহ
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
সদর উপজেলার বিষয়খালী বাজারে ধান বিক্রি করতে এসে ক্রেতার অপেক্ষায় এক কৃষক।ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঝিনাইদহের মাঠজুড়ে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের ভালো ফলন হলেও কৃষকদের মুখে হাসি নেই। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পরও বাজারে ধানের কাক্সিক্ষত দাম না পওয়ায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন জেলার হাজার হাজার কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ, সার, বীজ, সেচ, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বেড়েে গেলেও সেই তুলনায় ধাণের দাম বাড়েনি। বরং গতবারের চেয়ে কমদামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। ফলে লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি সদর উপজেলার তেতুলতলা, বিষয়খালী ও শৈলকুপার ভাটইবাজারে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, প্রতিমণ ধান আকারভেদে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত ধান লোকসানে বিক্রি না করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
জানা যায়, মৌসুমের শুরুতেই কৃষকদের জালানি তেল, সার, বীজ, ও শ্রমিক বাবদ অতিরিক্ত খরচ গুনতে হয়েছে। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে প্রতিমণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ দাঁড়িয়েছে ৯৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা পর্যন্ত। অথচ বর্তমানে খোলা বাজারে প্রতিমণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ১০৫০ টাকা দরে। এতে প্রতিমনে প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক কৃষক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে ঝিনাইদহ জেলার ৬ টি উপজেলায় ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর বোরো ধানের ফলন অন্যবারের চেয়ে তুলনামূলক বেশি হয়েছে।
যদিও কৃষকদের জন্য সরকার ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ বোরোধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সরকারি ভাবে প্রতিমণ ধান ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সাধারণ কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান দিতে না পারায় মাঠ পর্যায়ে সুবিধা নিচ্ছেন ফড়িয়া ও মজুদদারেরা।
সদর উপজেলার ফুরসন্ধি এলাকার কৃষক আইয়ুব আলী বলেন, “এ বছর ৫ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করেছিলাম। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। তবে বাজারে যে দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে তাতে আমাদের খরচের টাকা উঠছে না। শুনলাম সরকারি খাদ্য গুদামে বেশি টাকায় ধান কিনছে। সেখানে গিয়ে দেখি ধান বিক্রি করতে নানা ঝামেলা। তাই বাজারে এসে লোকসানে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে চাষাবাদ বাদ দিয়ে অন্য পেশায় চলে যেতে হবে”।
শৈলকুপার খালফলিয়া গ্রামের কৃষক কৃষ্ণপদ বিশ্বাস বলেন, “মৌসুমের শুরুতে সার, বীজ, ডিজেলসহ অন্যান্য খাতে বেশি খরচ করতে হয়েছে। তবে এবার ধানের ফলন দেখে আশা করছিলাম লাভের মুখ দেখবো। তবে তার বিপরীত ঘটনা দেখতে হলো। বাজারে গিয়ে যেমন ধানের দাম পাচ্ছি না অন্যদিকে আমাদের মত কৃষকরা সরকারি খাদ্য গুদামে গিয়েও ধান বিক্রি করতে পারছে না। গতদিন বাজারে ৬০ মণ ধান নিয়ে গেছিলাম। মাত্র ৮২০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে আসছি। ধার-দেনা করে ধানচাষ করেছিলাম মানুষের সেই টাকা শোধ করবো কেমন করে তা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি”।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, “আবহাওয়া অনুকূলে থাকার কারণে এবার পুরো জেলাজুড়ে বোরোধানের ভালো ফলন হয়েছে। ধান মাড়াইয়ের সময় আমরা কৃষকদের নানা ভাবে সহায়তা করেছি। কৃষকেরা যদি ধান সঠিক ভাবে শুকিয়ে সরাসরি সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারেন তবে তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এড়িয়ে লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন”।
এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুবীর নাথ চৌধুরী বলেন, “ঝিনাইদহ কৃষি নির্ভর জেলা। এ বছর এ জেলাতে প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। সেখানে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা মাত্র ৩ হাজার কৃষকের কাছ থেকে ৯ হাজার ১৫২ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করতে পারবো। এজন্য অধিকাংশ কৃষক বিভিন্ন ধরণের কথা বলছেন”।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের গুদামগুলোতে ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছি। এরপরও যদি মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য থাকে সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে”।