খুলনা অফিস
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত অবহেলায় খুলনার শিল্প খাত এখন স্থবির। অথচ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত খুলনা একসময় ছিল শিল্প, বাণিজ্য ও নৌ-অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল, নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, শিপইয়ার্ড, মৎস্য ও চিংড়ি শিল্পকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান।
খুলনার শিল্পাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, রূপসা থেকে দৌলতপুর পর্যন্ত বিস্তৃত বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন কার্যত বন্ধ। একসময় শ্রমিকদের পদচারণায় মুখর থাকা পিপলস জুট মিল, ক্রিসেন্ট জুট মিল, প্লাটিনাম জুট মিল ও খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। শিল্প এলাকার বড় অংশজুড়ে নীরবতা আর অচলাবস্থা।
এমন বাস্তবতায় নতুন সরকারের ঘোষিত ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রথম জাতীয় বাজেটে খুলনার জন্য আলাদা বরাদ্দ ও বিশেষ নীতি সহায়তার দাবি তুলেছেন ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজ এবং গবেষক ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, খুলনার শিল্প ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে পুনরায় কার্যকর করা গেলে শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, পুরো দেশের অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, খুলনায় এখন পর্যাপ্ত অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি, নৌ ও স্থল যোগাযোগের সুবিধা এবং মোংলা বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদ রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারায় অঞ্চলটি কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে পড়েছে।
খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক আবুল হাসান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খুলনা অঞ্চলের পাটকলগুলো অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। খুলনা একটি বিভাগীয় শহর হলেও এখানে কার্যকর বিমানবন্দর সুবিধা নেই। বহু আগে নির্মাণকাজ শুরু হলেও বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। শিল্প ও বিনিয়োগ বাড়াতে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি। তিনি আরও বলেন, মোংলা বন্দর ঘিরে শিল্পায়নের বড় সুযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, খুলনা অঞ্চলের সম্ভাবনা অনেক, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই শিল্প, যোগাযোগ, উপকূল রক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনায় রেখে সরকার একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করুক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুলনার অর্থনীতিকে সচল করতে হলে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, একই সঙ্গে শিল্পবান্ধব নীতিমালা, সহজ ঋণ সুবিধা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। উপকূলীয় পরিবেশগত সংকট নিরসন ও জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের দাবিতে এক সংবাদ সম্মেলনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন রায় বলেন, আমরা ২১ দফা দাবি দিয়েছি। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠন এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। উপকূল নিরাপদ না হলে শিল্প ও বিনিয়োগ নিরাপদ হবে না।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, খুলনার স্থানীয় পণ্য ও শিল্প খাতকে কেন্দ্র করে নতুন বিনিয়োগ সৃষ্টি করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নতুন গতি আসবে।
অধ্যাপক ফাহমিদা আক্তার অনি বলেন, এডিপিতে খুলনার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করে নতুন শিল্প ও কলকারখানা স্থাপন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প ও পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে খুলনায় নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোংলা বন্দর, খুলনা-যশোর রেল ও সড়ক যোগাযোগ, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন এবং কৃষি ও মৎস্যসম্পদের সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে খুলনা আবারও দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক হাবে পরিণত হতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলবাসীর প্রত্যাশা, নতুন সরকারের রেকর্ড বাজেটে খুলনার দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে শিল্প পুনরুজ্জীবন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।