পদ্মার চরে স্বাস্থ্যসেবায় দুর্ভোগ
বাঘা (রাজশাহী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬ ১৯:৩২ পিএম
আপডেট : ০১ জুন ২০২৬ ১৯:৪৭ পিএম
সেলিনা বেগম সন্তান সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। তার প্রসব বেদনা ওঠে। গভীর রাতে তাকে নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নৌকাতেই সন্তান প্রসব করেন তিনি।
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। পরে কোনোভাবে তাকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। বলছিলাম পদ্মার চরে স্বাস্থ্যসেবায় দুর্ভোগের কথা।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি চরাঞ্চলÑ আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরে প্রায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেখানে গড়ে ওঠেনি কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা কমিউনিটি ক্লিনিক। ফলে জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন চরবাসী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অসুস্থ হলে তাদের একমাত্র ভরসা গ্রাম্য চিকিৎসক। জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রসূতি মা কিংবা বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেতে হয় প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অথবা ৮০ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী শহরে।
চিকিৎসা নিতে হলে পদ্মা নদী ও দুর্গম চরাঞ্চল পাড়ি দিতে হয়। বর্ষায় নৌকায় যাতায়াত সম্ভব হলেও শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘ পথ হেঁটে চর পার হয়ে পরে নৌকায় নদী অতিক্রম করতে হয়।
আতারপাড়া চরের বাসিন্দা ছলেমান আলী বলেন, ‘আমার বৃদ্ধ মা অসুস্থ। রাতে কোনো সমস্যা হলে কখন নৌকা পাব, কীভাবে হাসপাতালে পৌঁছাব, সেই চিন্তায় থাকতে হয়। অনেক সময় রোগী পথেই মারা যায়।’
দিয়ারকাদিরপুর চরের বাসিন্দা বেল্লাল হোসেন জানান, এক রাতে মালেক আলী ব্যাপারীর মেয়ে সেলিনা বেগমের প্রসব বেদনা ওঠে। গভীর রাতে তাকে নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নৌকাতেই সন্তান প্রসব করেন তিনি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। পরে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
চৌমাদিয়া চরের গ্রাম্য চিকিৎসক মাসুম মোল্লা বলেন, সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া গেলেও হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা প্রসূতি জটিলতার মতো ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার থাকে না। দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়। কিন্তু দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না।
চকরাজাপুর ইউনিয়নের আতারপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান দর্জি বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা একটি কমিউনিটি ক্লিনিকের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এখনও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। চরবাসীর একমাত্র ভরসা গ্রাম্য চিকিৎসক।
তিনি জানান, আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুরÑ এই তিনটি ওয়ার্ডে প্রায় ৭৫০টি পরিবার ও ৫ হাজার ৫০ জন মানুষের বসবাস। ভোটার সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯১৬ জন। অথচ পুরো এলাকায় রয়েছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। নেই কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রও।
এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, চকরাজাপুর ইউনিয়নে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। অন্যটির কাজ চলমান রয়েছে। তবে চৌমাদিয়া, আতারপাড়া ও দিয়ারকাদিরপুর এলাকায় কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক নেই। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়া ক্লিনিক পুনঃস্থাপন এবং একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, পদ্মার চরাঞ্চলে বসবাসকারী হাজারো মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হোক। অন্যথায় চিকিৎসাসেবার অভাবে জীবনঝুঁকি ও দুর্ভোগ আরও বাড়বে।