বৃষ্টির মধ্যেই শোলাকিয়ায় ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীন কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃষ্টির মধ্যেই বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ঈদের নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। ঈদের সকালকে ঘিরে আনন্দ-উচ্ছ্বাস থাকলেও এবার সেই আবহে যোগ হয় টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার চ্যালেঞ্জ। তবে প্রতিকূল আবহাওয়াও দমাতে পারেনি ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। সকাল ৭টা থেকেই মানুষ আসতে শুরু করেন শোলাকিয়া মাঠে। জায়নামাজ বিছিয়ে অপেক্ষা করেন প্রধান জামাতে শরিক হওয়ার জন্য।
শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে তিন দফা শটগানের গুলি ফুটিয়ে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় ঈদের জামাত। জামাতে ইমামতি করেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হয়বতনগর এ ইউ কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই। নামাজ শেষে মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করা হয়।
দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে রেল মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চলাচল করে শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল ৬টায় কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। নামাজ শেষে দুপুর ১২টায় ট্রেন দুটি পুনরায় নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবে।
ঈদগাহ ময়দানে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দেশ, জাতি এবং মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
তবে ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় শোলাকিয়ায় মুসল্লির উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোরবানির প্রস্তুতি ও আশপাশের মসজিদে আগেই জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ায় মুসল্লির সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।
শোলাকিয়ার জামাতকে ঘিরে নেওয়া হয় পাঁচ স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠজুড়ে মোতায়েন ছিল পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয় আর্চওয়ে, ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও কুইক রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিক্যাল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। স্কাউট সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জামাতে অংশ নেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল, কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “প্রতিকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেছেন। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের উন্নয়নের জন্য ডিও লেটার দিয়েছে এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা আশা করছি, আগামী ঈদুল ফিতরের আগেই ঐতিহাসিক এই ঈদগাহ মাঠটি একটি নান্দনিক ও আধুনিক ময়দানে রূপ নেবে। তখন বৃষ্টিজনিত ভোগান্তিসহ বিভিন্ন সমস্যা অনেকটাই দূর হবে”।
তিনি আরও বলেন, “প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে যারা ঈদের জামাতে অংশ নিয়েছেন, তাদের সবাইকে অভিনন্দন। একই সঙ্গে ঈদের জামাত সুষ্ঠু ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানাই”।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ঈদুল আজহার জামাত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বরাবরের মতো এবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে, যাতে মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করতে পারেন। প্রতিকূল আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেও মুসল্লিরা শান্তিপূর্ণভাবে জামাতে অংশ নিয়েছেন। সার্বিকভাবে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখেই ঈদের জামাত সম্পন্ন হয়েছে”।
জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল বলেন, “আগামী বছর শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ২০০তম ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এ উপলক্ষে মাঠটিকে আধুনিক, নান্দনিক ও আন্তর্জাতিক মানের ঐতিহাসিক স্থানে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে দেশ-বিদেশের মুসলমানরা এটি দেখে মুগ্ধ হন। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে এবং তাঁর দিকনির্দেশনায় উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের আশা করছি”।