মধ্যাঞ্চলীয় অফিস
প্রকাশ : ২৬ মে ২০২৬ ১৫:৩৬ পিএম
শোলাকিয়ায় ঈদ জামাতে ইমামতি করবেন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের সর্ববৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। এবার ১৯৯তম পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৯টায়।
ঈদ জামাতে ইমামতি করবেন কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বড় বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন হয়বতনগর এ. ইউ. কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই। এছাড়া প্রতি বছরের মতো সকাল ৮টায় সূর্যবালা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নারীদের জন্য পৃথক ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ইমামতি করবেন মাওলানা মোহাম্মদ সানাউল্লাহ এবং বিকল্প ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুল কাইয়ুম।
শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন মঙ্গলবার দুপুরে এই তথ্য জানান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং র্যাব-১৪ সিপিসি-২ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের স্কোয়াড্রন লিডার মো. আলী নোমান পৃথকভাবে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। পরে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলামও ঈদ জামাতের সার্বিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, “ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হবে এবং এ উপলক্ষে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ঈদগাহ মাঠ ও পুরো শহরের নিরাপত্তায় প্রায় ৬০০ জন পুলিশ সদস্য, দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য এবং ৫৫ জন র্যাব সদস্য মোতায়েন থাকবে। মাঠে ৪টি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে এবং পুরো এলাকাকে ৮টি সেক্টরে ভাগ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। এছাড়া ৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দায়িত্ব পালন করবেন”।
তিনি জানান, পুরো ঈদগাহ মাঠজুড়ে ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হবে। দূরের মুসল্লিদের সুবিধার্থে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ভৈরব থেকে বিশেষ ট্রেন সকাল ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায়। অন্যদিকে ময়মনসিংহ থেকে বিশেষ ট্রেন সকাল ৫টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে। উভয় ট্রেনই ফিরতি যাত্রা শুরু করবে দুপুর ১২টায়।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে মাঠে ৫০টি অস্থায়ী অজুখানা, ২০টি স্থায়ী টয়লেট ও ২০টি ইউরিনালের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ২০০০ লিটার ধারণক্ষমতার দুটি অস্থায়ী পানির ভ্যান স্থাপন করা হবে। মাঠসংলগ্ন পুকুরেও অজুর ব্যবস্থা থাকবে। চিকিৎসাসেবার জন্য অ্যাম্বুলেন্স, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীসহ মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত থাকবে বলেও জানান তিনি।
নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিরা জায়নামাজ ছাড়া অন্য কোনো বস্তু নিয়ে মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন না। প্রবেশপথে তল্লাশির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৬১৬ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টার নিরাপত্তা পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা দায়িত্ব পালন করছেন। ৩২টি চেকপোস্ট, ৭টি আর্চওয়ে গেট ও ৫০টি মেটাল ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরো এলাকাজুড়ে ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নিরাপত্তা তদারকিতে ড্রোন ও ভিডিও ক্যামেরাও ব্যবহার করা হবে”।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, “টর্চলাইট, ম্যাচ বা দাহ্য কোনো বস্তু সঙ্গে আনা যাবে না। মোবাইল ফোন সঙ্গে আনা গেলেও তা সাইলেন্ট মোডে রাখতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বোম্ব ডিসপোজাল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া র্যাব, সিআইডি, পিবিআই ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটসহ বিভিন্ন সংস্থা মাঠে দায়িত্ব পালন করবে। ইতোমধ্যে পুরো এলাকায় সুইপিং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে”।
অন্যদিকে র্যাব-১৪ সিপিসি-২, কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের স্কোয়াড্রন লিডার মো. আলী নোমান বলেন, “শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে র্যাব-১৪। কন্ট্রোল রুম, ওয়াচ টাওয়ার ও অবজারভেশন পোস্টের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি পরিচালনা করা হবে। চেকপোস্ট ও মোবাইল টহলের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং তল্লাশি কার্যক্রম চলবে। ড্রোন, বাইনোকুলার ও সিসিটিভির মাধ্যমে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে”।
তিনি আরও জানান, মাঠের ওয়াচ টাওয়ারগুলোতে স্নাইপার টিম মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত থাকবে। শোলাকিয়া মাঠ সংলগ্ন পশুর হাটে প্রতারণা ও জাল নোট প্রতিরোধে র্যাবের বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করবে বলেও জানান তিনি।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “যেভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং মুসল্লিরা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন, ঠিক তেমনি এবারের ঈদুল আজহার জামাতও সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন হবে বলে আমি আশাবাদী”।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের নামাজ চলাকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই শোলাকিয়া ঈদ জামাতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।