সাতক্ষীরা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ মে ২০২৬ ২২:৪২ পিএম
আপডেট : ২৪ মে ২০২৬ ২২:৫৫ পিএম
সাতক্ষীরা উপকুলীয় এলাকায় আজও আইলার ক্ষত শুকায়নি। ১৭ বছর আগে ২০০৯ সালের ২৫ মে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা ‘আইলা’ আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুলীয় জনপদে।
মুহূর্তের মধ্যে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি ও খুলনা জেলার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমিষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় নারী ও শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষকে। শেষ হয়ে যায় হাজার হাজার গবাদি পশু আর ঘরবাড়ি। নিমিষেই গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজার হাজার পরিবার। চিংড়ি ঘের আর ফসলের ক্ষতি ছিল অবর্ণনীয়। ধ্বংস হয়ে যায় উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ আর ভেঙে চুরমার হয়ে যায় অসংখ্য ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু
দাউদ ঢালী জানান, ২০০৯ সালের ২৫ মে এই দিনে ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস আইলার আঘাতে লন্ডভন্ড
হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতা বেগের জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকুলীয়
সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায়। এ সময় তিনটি ইউনিয়নের ৬৭ জন নারী, পুরুষ ও
শিশু নিহত হয়। ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও অনেক পরিবার ঘরে ফিরতে পারিনি। খাবার
পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। তিনি আরও বলেন, নদী রক্ষা বেড়িবাঁধগুলো নষ্ট
হয়ে যাওয়ার কারণে প্রতিবছর ভাঙন দেখা দেয়। ফলে, প্রতিবছর মানুষ কোনো না কোনো প্লাবন
বা দুর্যোগের শিকার হচ্ছে।
চেউটিয়া গ্রামের আম্বিয়া খাতুন জানান,
আইলার পর থেকে খাজরা ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে তীব্র খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
অধিকাংশ জলাশয় লবণ পানি উঠে নষ্ট হয়ে যায়। দুই একটি পুকুর ভালো থাকলেও মাইলের পর
মাইল পায়ে হেঁটে লাইন দিয়ে পানি নিতে হয়। জনস্বাস্থ্য বিভাগ থেকে পানি ধরার ড্রামের
ব্যবস্থা করলেও প্রয়োজনের তুলনায় সেগুলো অনেক কম। ফলে, খাবার পানির জন্য আজও যুদ্ধ
করতে হয়।
চাকলা গ্রামের তৌহিদুল ইসলাম জানান,
১৭ বছর আগে ঘটে যাওয়া প্রলঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাত এখনো রয়ে গেছে। একটু বাতাস
হলেই বেড়িবাঁধগুলো ভেঙে পানির ভেতরে প্রবেশ করে। রাস্তাঘাটগুলো আঁকিজ হয়ে রয়েছে।
আজও পর্যন্ত চাকলা গ্রাম থেকে সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় সহজে যাতায়াত করা সম্ভব
হয়ে ওঠেনি। তাদের দাবি, ত্রাণ নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক।
গাবুরা গ্রামের শাহিনুর রহমান জানান, উচ্চ বিত্ত থেকে শুরু করে নিম্মবিত্ত সবাই চালাচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। বেকারত্বের কারণে কাজের সন্ধানে মানুষ নিজ বাসভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল ওই এলাকার মানুষের জীবনযাপন এখন দূর্বিষহ হয়ে পড়েছে। আইলার পর পরই কিছু সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু কাজের বিনিময় খাদ্য প্রকল্পের কাজ হলেও এখন আর কোনো কাজ হচ্ছে না। ক্রমে বাড়ছে দরিদ্র ও অতি দরিদ্রের সংখ্যা।
আইলার পর ১৭ বছর অতিবাহিত হলেও পানি
উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধগুলো পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় প্রায় আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন
স্থানে ভেঙে বছরে একাধিক বার তলিয়ে যেতে দেখা গেছে। ফলে ঝূঁকিতে রয়েছে এ জনপদের
মানুষ। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো পাঠদানের উপযোগী হয়নি।
আশাশুনি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা
শ্যামানন্দ কুন্ডু বলেন, উপজেলার বেড়িবাঁধ ভাঙনরোধে বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ চলমান রয়েছে।
এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া
পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের সামনে বর্ষাকাল ভেবে সবসময় প্রস্তুতি থাকতে বলা হয়েছে।
খাবার পানির জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।