আকাশজুড়ে ঘুড়ি, মিষ্টিতে মাছের হাসি
কোথাও চং, কোথাও ঈগল, কোথাও আবার দেখা মিলবে কঙ্কাল আকৃতির ঘুড়ি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সকাল গড়াতেই বগুড়ার দাঁড়িয়াল গ্রামের আকাশ যেন রঙিন ক্যানভাস। কোথাও চং, কোথাও ঈগল, কোথাও আবার কঙ্কাল আকৃতির ঘুড়ি। ছোট ছোট ছেলেরা দৌড়ে সুতো ছাড়ছে, বড়রা আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘুড়ির কাটাকাটি দেখছে। কেউ ঘুড়ি কিনে কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছে, কেউ মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে নতুন ঘুড়ির বাঁশি শুনছে।
মেলার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখ আটকে যায় বিশাল এক মাছের দিকে। কাছে গিয়ে বোঝা যায়, সেটি আসলে মিষ্টি। ১৫ কেজি ওজনের মাছ আকৃতির সেই মিষ্টি ঘিরে মানুষের ভিড় লেগেই আছে।
বগুড়া সদর উপজেলার নুনগোলা ইউনিয়নের দাঁড়িয়াল গ্রামের এই আয়োজন স্থানীয়দের কাছে ‘নিশানের মেলা’ নামে পরিচিত। তবে জেলার মানুষের কাছে এটি ঘুড়ির মেলা হিসেবেই বেশি পরিচিত। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রবিবার বসে এ মেলা। স্থানীয়দের ভাষ্য, দেড়শ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসছে এই ঐতিহ্য।
মেলার ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় সারি সারি ঘুড়ির দোকান। লাল, হলুদ, নীল, সবুজ নানা রঙের ঘুড়িতে সাজানো প্রতিটি স্টল। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ‘চং’ নামের ঘুড়ি। আকারভেদে ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে এসব ঘুড়ি।
ঘুড়ি কিনতে আসা স্কুলছাত্র রাকিব হাসান বলছিল, “সারা বছর এই মেলার জন্য অপেক্ষা করি। এবার তিনটা চং ঘুড়ি কিনেছি। বন্ধুদের সঙ্গে বিকালে ওড়াব”।
মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি উড়াচ্ছিলেন কলেজপড়ুয়া সুমন আলী। তিনি বলেন, “মোবাইলের যুগে এখন আগের মতো মাঠে খেলা হয় না। কিন্তু এই মেলা এলেই সবাই আবার ছোটবেলার মতো হয়ে যায়। ঘুড়ির টানটাই আলাদা”।
শুধু ঘুড়িই নয়, মেলায় দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ মাছ আকৃতির বিশাল মিষ্টি। ১৫ কেজি ওজনের একটি মাছ মিষ্টি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ছয় হাজার টাকায়। দোকানগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে ছবি তুলছেন, কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন, কেউ আবার কিনে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন আত্মীয়স্বজনের জন্য।
মিষ্টির দোকানি শফিকুল ইসলাম বলেন, “এই মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখন মাছ মিষ্টি। অনেকে শুধু এটা দেখতেই আসে। আমরা তিন দিন ধরেই মিষ্টি তৈরি করছি। এবার প্রায় ৭০ মণ মিষ্টি এনেছি”।
আরেক ব্যবসায়ী আবদুল মালেক জানান, একদিনের মেলা হলেও বেচাকেনা চলে তিন দিন পর্যন্ত। তার দোকানে রস কদম, কালোজাম, ছানা জিলাপি, মৌচাক, কাটারি ভোগ- সব ধরনের মিষ্টি আছে। প্রতি কেজি ২২০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
মেলায় ঘুরে দেখা যায়, অন্তত ১৫টির বেশি মিষ্টির দোকান বসেছে। প্রতিটি দোকানেই ৫০ মণের বেশি মিষ্টি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কেউ বিক্রি করছেন, কেউ পেছনে বসে ব্যস্ত নতুন মিষ্টি তৈরিতে। বড় বড় ডেকচিতে ছানা নামানো হচ্ছে, আরেক পাশে কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে জিলাপি। মিষ্টির গন্ধে পুরো এলাকা যেন উৎসবের আলাদা আবহ তৈরি করেছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আজাহার আলী বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই মেলা দেখে আসছি। আগে শুধু ঘুড়ির জন্য মানুষ আসত। এখন মিষ্টির কারণেও অনেক দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। এই মেলাই দাঁড়িয়াল গ্রামের পরিচয়”।
বগুড়া শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের এই গ্রামটি বছরের বেশির ভাগ সময়ই শান্ত। কিন্তু জ্যৈষ্ঠের দ্বিতীয় রবিবার এলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে দাঁড়িয়াল গ্রাম। শিশুদের হাতে ঘুড়ির সুতো, বড়দের হাতে মিষ্টির প্যাকেট আর আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ির উৎসব যেন গ্রামবাংলার পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।