কয়রার ওড়াতলা খালে ভাঙা কালভার্টের পরিবর্তে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছে মানুষ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদশে
খুলনার কয়রা উপজেলার ওড়াতলা খালের ওপর নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ার ছয় বছর পার হলেও এখনও নির্মাণ হয়নি নতুন কোনো সেতু বা কালভার্ট।
ফলে ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার করছেন অন্তত পাঁচ গ্রামের হাজারো মানুষ ও শত শত শিক্ষার্থী।
স্থানীয় বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলে তারা অভিযোগ করেন, নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই ব্রিজটির পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করে এবং বেরিয়ে আসে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর চিত্র।
দীর্ঘ অবহেলা ও ২০২০ সালের তীব্র জোয়ারে একপর্যায়ে ব্রিজটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, জানান তারা।
খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন ১৩-১৪/১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় ২ নম্বর কয়রা ওড়াতলা খালের ওপর ১৯৯৬ সালে এই ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
এলাকাবাসীর দাবি, নির্মাণের শুরু থেকেই সেখানে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল এবং নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে দ্রুত ফাটল দেখা দেয়।
২০২০ সালে ব্রিজটি সম্পূর্ণ ধসে পড়ে যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে যায়। এরপর থেকে স্থানীয়দের উদ্যোগে তৈরি করা বাঁশের সাঁকোই এই অঞ্চলের মানুষের একমাত্র ভরসা বলেও জানান তারা।
সরেজমিনে গিয়ে শুক্রবার বিকালে দেখা যায়, খালের দুই পাড়কে সংযুক্ত করেছে একটি নড়বড়ে বাঁশের পুল। এই পথ ব্যবহার করে ২ নম্বর কয়রা, ওড়াতলা, গোবরা, হরিণখোলা ও পূর্বচকসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষ উপজেলা সদরে যাতায়াত করছেন।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীরা। প্রায়ই বাঁশের পুল থেকে পিছলে খালে পড়ে বই-খাতা ভিজে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
অভিযোগ রয়েছে, ব্রিজটি না থাকায় পুরো এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে। ভ্যান, ইজিবাইক কিংবা পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করতে না পারায় কৃষিপণ্য ও মৎস্য ঘেরের মাছ বাজারজাত করতে দ্বিগুণ খরচ গুনতে হচ্ছে স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন বলেন, ১৯৯৬ সালে ব্রিজটি নির্মাণের সময়ই কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণেই আজ আমাদের এই দুর্ভোগ। ৬ বছর ধরে এভাবেই ভেঙে পড়ে আছে। এরপর নিজেরা টাকা তুলে বাঁশের পুল তৈরি করেছি।
কিন্তু রাতের বেলা কোনো রোগী বা প্রসূতি মাকে হাসপাতালে নিতে গেলে চরম বিপদে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কয়রা সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মাসুম বিল্লাহ বলেন, ওড়াতলা খালের ব্রিজটি ভেঙে যাওয়ার পর মানুষের কষ্টের সীমা নেই। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার হচ্ছে
বিষয়টি তিনি ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয় সভায় একাধিকবার উত্থাপন করেছেন বলেও দাবি তার।
কয়রা সদর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, ভাঙা কালভার্টটির কারণে কয়েকটি গ্রামের মানুষ কার্যত উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও এলজিইডি কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে, যাতে দ্রুত প্রকল্পের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা যায়।
কয়রা উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) ইঞ্জিনিয়ার আফজাল হোসেন জানান, ২ নম্বর কয়রা ওড়াতলা খালের ব্রিজটি দীর্ঘদিন আগে নির্মিত হয়েছিল এবং বর্তমানে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত।
নতুন একটি গার্ডার ব্রিজ বা টেকসই কালভার্ট নির্মাণের জন্য তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ শুরু করা হবে বলেও জানান তিনি।
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসায় নতুন করে আতঙ্কে রয়েছেন এলাকাবাসী।
এ সময় জোয়ারের পানি বাড়লে তাদের শেষ ভরসা বাঁশের সাঁকোটিও তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তাই বড় কোনো দুর্ঘটনার আগেই দ্রুত টেকসই সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।