× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক

এক বছরেই ১৬০ প্রাণহানি—ঝুঁকি কমাতে শুরু বড় প্রকল্প

নুপা আলম, কক্সবাজার

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ২২:৫০ পিএম

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬ ২২:৫১ পিএম

এক বছরেই ১৬০ প্রাণহানি—ঝুঁকি কমাতে শুরু বড় প্রকল্প

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়ক চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এখন যেন এক নীরব মৃত্যুফাঁদ। সড়কজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৭৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক, অপ্রশস্ত পথ ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। শুধু গত এক বছরে এ মহাসড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬০ জনের বেশি মানুষ, আহত হয়েছেন প্রায় ৪০০ জন।

দীর্ঘদিনের এই ঝুঁকি কমাতে অবশেষে শুরু হয়েছে সড়ক প্রশস্তকরণ, চার লেনে উন্নীতকরণ এবং বিপজ্জনক বাঁক সরলীকরণের কাজ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সার্ভিস লেনসহ ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার।
চট্টগ্রামের চুনতির জাঙ্গালিয়া এলাকা; যা দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনার ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত। সেখানেই এখন দৃশ্যমান পরিবর্তন। সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের দুই পাশে গাছ কাটার পাশাপাশি চলছে মাটি ভরাট, ইট ফেলা ও রোলার দিয়ে মাটি শক্ত করার কাজ। শ্রমিকদের ব্যস্ততায় এলাকা এখন এক নির্মাণযজ্ঞে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের আওতায় প্রায় ৯০০ মিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। একই এলাকায় কক্সবাজার অংশে আরও ৭০০ মিটার উন্নয়ন কাজ চলছে। অর্থাৎ, মোট প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিটার সড়ক চার লেনে রূপ নিচ্ছে।
চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগ (দক্ষিণ)-এর রোলার অপারেটর মোহাম্মদ রিয়াজ বলেন, কক্সবাজারমুখী চার লেন সড়ক উন্নয়ন কাজ চলছে। প্রায় এক মাস ধরে কাজ করছি। বর্তমানে নির্ধারিত অংশের একটি লেনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে।
মোহাম্মদ রিয়াজ আরও বলেন, বর্তমানে রোলার দিয়ে মাটি শক্ত করার কাজ চলছে। পাশাপাশি সড়কের বর্ধিত অংশে মাটি ও ইট ফেলে ভরাটের কাজও করা হচ্ছে।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পুরো মহাসড়কে চিহ্নিত ৭৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনকগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরলীকরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চকরিয়া কলেজ, বরইতলী ও ইনানী এলাকায় ছয়টি বাঁক সোজা করার কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার অংশের ৬৬ কিলোমিটার সড়ক ২২ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৩৪ ফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন। এরই মধ্যে ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সড়কের উন্নয়ন কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে মহাসড়কের গড় প্রস্থ মাত্র ২২ ফুট (৬.৭ মিটার), যা বর্তমান যানবাহনের চাপের তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে প্রায়ই ঘটছে মুখোমুখি সংঘর্ষ।
সড়ক বিভাগ কক্সবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকনউদ্দিন খালেদ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়কে মোট ৭৭টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে যেসব বাঁক সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনাপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরলীকরণের কাজ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাঁক চিহ্নিত করে সড়কটিকে যতটা সম্ভব সোজা ও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মহাসড়কের এই অংশ বর্তমানে প্রায় ৬ দশমিক ৭ মিটার বা ২২ ফুট প্রশস্ত। তুলনামূলক সরু হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সার্ভিস লেনসহ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব স্থানে দুর্ঘটনার হার বেশি, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সরলীকরণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কিছু অংশে সড়কের প্রস্থ ৬ দশমিক ৭ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৩ মিটার বা প্রায় ৩৪ ফুটে উন্নীত করার কাজ চলছে। জাঙ্গালিয়া এলাকায় কক্সবাজার সড়ক বিভাগের আওতায় ৭০০ মিটার এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগের আওতায় আরও ৯০০ মিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। অর্থাৎ একই এলাকায় মোট প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিটার সড়ক চার লেনে রূপান্তর করা হবে।
এছাড়া বাকি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো সরলীকরণের অংশ হিসেবে ১১ দশমিক ৭২ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে জাঙ্গালিয়া থেকে এসএমঘাট সেতু পর্যন্ত সড়ককে ১০ দশমিক ৩ মিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলে জানান তিনি।
চালক ও যাত্রীদের অভিযোগ, সড়কের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বিভাজক না থাকা, লবণবাহী ট্রাক থেকে পানি পড়ে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া সড়ক, অদক্ষ চালক ও বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে।
হানিফ পরিবহনের চালক রুহুল আমিন বলেন, ইজিবাইক, সিএনজি ও মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তার ওপর লবণবাহী ট্রাকের কারণে সড়ক পিচ্ছিল হয়ে যায়।
শ্যামলী পরিবহনের চালক ইদ্রিস আলী জানান, চুনতি, জাঙ্গালিয়া, ইনানী, বরইতলী, ডুলাহাজারা- এসব এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। শুধু বাঁক ঠিক করলেই হবে না, সড়ককে ছয় লেনে উন্নীত করা জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এ সময় লবণ ও মাছবাহী ভারী যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়, ফলে সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। চকরিয়ার বাসিন্দা এনামুল সিকদার বলেন, “রাত তিনটা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত সড়কে ভারী যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। তখন দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।”
যাত্রীদের মধ্যেও এই মহাসড়ক নিয়ে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। অনেকেই বলছেন, প্রয়োজনের তাগিদে যাতায়াত করলেও প্রতিটি যাত্রাই যেন অনিশ্চয়তায় ভরা। এক যাত্রী বলেন, ২০ বছর আগে যেমন ছিল, এখনও অনেকটা তেমনই আছে। কিন্তু এখন বড় বাস চলাচল করছে—ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
পর্যটকদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ট্রেনের টিকিট না পেলে বাধ্য হয়ে সড়কপথে যাত্রা করতে হচ্ছে, আর সেই যাত্রাই হয়ে উঠছে আতঙ্কের। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বলছে, মহাসড়কটি ছয় বা আট লেনে উন্নীত করা গেলে দুর্ঘটনা ও যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পর্যটননির্ভর কক্সবাজারে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রবেশ করছে, যা বর্তমান সড়ক সামাল দিতে পারছে না। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই মহাসড়ককে আধুনিক ও প্রশস্ত সড়কে রূপান্তর করা ছাড়া বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-এর কক্সবাজার কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, পর্যটননির্ভর জেলা হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল সংখ্যক যানবাহন প্রতিদিন কক্সবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই তুলনায় সড়কগুলো এখনো অনেক সংকীর্ণ। ফলে অতিরিক্ত যানচাপের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, সড়কগুলোকে ছয় বা আট লেনে উন্নীত করা গেলে যানজট ও দুর্ঘটনা-দুটিই অনেকাংশে কমে আসবে।
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা