সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ১৬:২১ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৬ ১৬:৪১ পিএম
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু শুধু একটি ফল নয়, এটি এখন পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। টসটসে রসালো শাঁস, ছোট বিচি, মধুর মতো মিষ্টি স্বাদের কারণে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছে এই লিচু।
বছরের এই সময়টায় মঙ্গলবাড়িয়া গ্রাম যেন এক লাল-গোলাপি স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হয়। গাছে গাছে ঝুলে থাকা পাকা লিচুর সৌন্দর্য পুরো এলাকায়। দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন ক্রেতা, ব্যবসায়ী, দর্শনার্থী ও ভ্রমণপিপাসুরা। এবার অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলনে খুশি চাষিরা। কৃষি বিভাগের আশা, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লিচু বিক্রি হবে।
মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারি সারি লিচুগাছ। সড়কের দুপাশে, বাড়ির উঠানে, পুকুরপাড়ে, এমনকি জমির আইলজুড়েও রয়েছে লিচুর গাছ। লিচুর ভারে নুয়ে পড়েছে অনেক গাছের ডাল। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানজুড়ে চলে ব্যস্ততা। শ্রমিকরা গাছে উঠে লিচু সংগ্রহ করছেন, ব্যবসায়ীরা বাগানেই দরদাম করছেন, আবার কেউ কেউ গাছ দেখে পছন্দ করে আগাম পুরো গাছের লিচু কিনে নিচ্ছেন।
প্রতিদিন রাজধানী ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত মানুষ ভিড় করছেন মঙ্গলবাড়িয়ায়।
স্থানীয়দের দাবি, মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর ইতিহাস প্রায় ২২৫ বছরের পুরনো। গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি কবির মিয়া, তাহের আলীসহ কয়েকজন জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনাÑ ১৮০২ সালের দিকে মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামের এক ব্যক্তি চীন দেশে গিয়েছিলেন। ফেরার সময় তিনি সঙ্গে করে দুটি লিচুর চারা নিয়ে আসেন। পরে সেই চারা গ্রামে রোপণ করা হয়। ধীরে ধীরে সেই গাছ থেকেই বিস্তার লাভ করে এ অঞ্চলের বিখ্যাত লিচু। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবাড়িয়া ছাড়াও আশপাশের কুমারপুর, নারান্দী ও হোসেন্দী গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এই লিচুর চাষ। বর্তমানে পুরো অঞ্চলই ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচু’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবাড়িয়া ও আশপাশের গ্রামগুলোতে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজারের বেশি লিচুগাছ রয়েছে। শুধু মঙ্গলবাড়িয়া গ্রামেই প্রায় ২০০ পরিবার বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষ করছেন। অনেক পরিবারের সারা বছরের বড় অংশের আয় আসে এই লিচু থেকে।
বর্তমানে বাগানের আকার ও মানভেদে প্রতি ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
গ্রামের মেয়ে সাদিয়া বলেন, ‘এটা আমার নিজের গ্রাম। আমি বর্তমানে ঢাকায় থাকি, কিন্তু লিচুর মৌসুমে এখানে না এলে ভালো লাগে না। এখানে আমাদের ছোট একটি লিচুর বাগান আছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও সহকর্মীদের জন্য লিচু নিচ্ছি।’
গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি সাবেক শিক্ষক রুহুল আমিন বলেন, ‘মঙ্গলবাড়িয়ার লিচুর ইতিহাস অনেক পুরনো। বর্তমানে পুরো এলাকায় আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার লিচুগাছ রয়েছে। আমার নিজেরই ১৪২টি গাছ আছে। এ বছর এখন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার টাকার লিচু বিক্রি করেছি, এখনও কয়েকটি গাছের লিচু বাকি আছে।’
লিচুচাষিদের অভিযোগ, উপজেলা কৃষি অফিস থেকে তারা পর্যাপ্ত সহযোগিতা পান না। নিয়মিত পরামর্শ, আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতি ও রোগবালাই দমনে কার্যকর সহায়তা পেলে ফলন আরও বাড়ানো সম্ভব হতো বলে দাবি তাদের।
পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর-ই-আলম বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ ইতোমধ্যে লিচুচাষিদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা করেছে। গত বছরের মতো এবারও চাষিরা ন্যায্যমূল্যে লিচু বিক্রি করতে পারবেন বলে আমরা আশা করছি। পরিমিত বৃষ্টিপাত ও সহনীয় তাপমাত্রার কারণে এ বছর ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার লিচু বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।’
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবার ৩৬ জন কৃষককে ফুট পাম্প দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা সহজে লিচুগাছে স্প্রে করতে পারেন ও ভালো ফলন পান। এ ছাড়া ভালো পরাগায়নের জন্য মৌচাষ বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে গত বছরের তুলনায় এবার ফলন আরও বেড়েছে।’