মধ্যাঞ্চলীয় অফিস
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৬ ১৩:৪৯ পিএম
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন হামলায় নিহত কিশোরগঞ্জের যুবক জাহাঙ্গীর। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার যুবক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন (২৫)।
উন্নত জীবনের স্বপ্ন, সংসারের অভাব ঘোচানো এবং পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যাশা নিয়ে মাত্র চার মাস আগে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতায় নিভে গেল তার জীবনের প্রদীপ।
নিহত জাহাঙ্গীর কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের কান্দাইল বাগপাড়া গ্রামের মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে। তার মৃত্যুতে পরিবার ও পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান জাহাঙ্গীর। এরপর মা জাকিয়া বেগম তিন সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান। পোশাক কারখানায় চাকরি করে সন্তানদের বড় করেন তিনি।
দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়েছেন জাহাঙ্গীর। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে এবং ছোট ভাই-বোন, স্ত্রী ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
স্বজনদের ভাষ্য, বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় চার মাস আগে রাশিয়ায় যান জাহাঙ্গীর। পরিবারের সদস্যরা জানতেন, তিনি সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।
তবে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তিনি রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যুক্ত হলেন, সে বিষয়ে কিছুই জানে না পরিবার।
তাদের দাবি, গত সোমবার ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় তিনি নিহত হন। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি বার্তা তারা পাননি।
জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর খবর প্রথমে আসে তার আরেক সহকর্মীর মাধ্যমে।
রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে কর্মরত টাঙ্গাইলের মৃদুল নামে এক বাংলাদেশি বৃহস্পতিবার ভিডিও বার্তায় তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর থেকেই পরিবারে নেমে আসে শোকের মাতম।
শনিবার সকালে জাহাঙ্গীরের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িজুড়ে চলছে কান্না আর আহাজারি। উঠানে বসে বারবার ছেলের কথা মনে করে ভেঙে পড়ছেন মা জাকিয়া বেগম। শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি।
স্বামীর মৃত্যুর সংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী মাসুদা হোসেন। স্বামীর ব্যবহৃত কাপড় ও ছবি বুকে জড়িয়ে নির্বাক বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।
এদিকে বাবার মৃত্যুর খবর পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি আড়াই বছরের শিশু সন্তান আযান হোসেন।
বাড়িতে আসা প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, জাহাঙ্গীর ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও পরিশ্রমী একজন যুবক।
নিহতের ছোট ভাই জাবেদ হোসেন বলেন, ভাই পরিবারের জন্য অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিল। অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে তাকে পাঠানো হয়েছিল। আমরা জানতাম সে ভালো কোনো কাজে আছে।
হঠাৎ ভিডিও বার্তায় তার মৃত্যুর খবর পাই। এখন আমরা কী করব বুঝতে পারছি না বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, কীভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিল, সেটাও আমাদের জানা নেই। এখন আমরা শুধু ভাইয়ের মরদেহ ফেরত চাই।
প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুস বলেন, জাহাঙ্গীর খুবই ভদ্র ছেলে ছিল। পরিবারের জন্য অনেক কষ্ট করত। বিদেশে গিয়ে ভালো কিছু করবে, এটাই ছিল তার স্বপ্ন। কিন্তু এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে, তা কেউ ভাবতে পারেনি।
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এমরানুল কবির জানান, বিষয়টি তারা শুনেছেন এবং পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে জাহাঙ্গীরের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। একই সঙ্গে তারা সরকারের সহযোগিতাও কামনা করেছেন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।