কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল
কিশোরগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে চ্যাপা শুঁটকি পরিচর্যা করছেন এক গৃহিণী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঈদুল আজহা (কোরবানি ঈদ) মানেই কিশোরগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে কয়েক দিনের উৎসবমুখর ভোজন। গরু, ছাগল কিংবা মহিষের মাংসে ভরে যায় ঘরের হাঁড়ি। সকাল-দুপুর-রাত তিন বেলায় চলে মাংসের নানা পদ। আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি দাওয়াত, গ্রামীণ আড্ডা আর অতিথি আপ্যায়নে যেন গোশতেরই জয়জয়কার। কিন্তু টানা দুই-তিন দিন ভারী খাবারের পর বদলে যায় চিত্র। অনেকেই তখন মুখ ফেরান মাংস থেকে। জিভে লাগে ভিন্ন স্বাদের খোঁজ। আর ঠিক তখনই হাওরাঞ্চলের রান্নাঘরে ফিরে আসে পুরনো ঐতিহ্য ‘চ্যাপা শুঁটকি’।
কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী কিংবা সুনামগঞ্জের হাওরপাড়ে ঈদের পর অন্তত দুই সপ্তাহ ধরে চ্যাপা শুঁটকির কদর বেড়ে যায় কয়েকগুণ। স্থানীয় বাজারগুলোতে জমে ওঠে শুঁটকির বেচাকেনা। বিশেষ করে চ্যাপা শুঁটকি দিয়ে ভর্তা, ভুনা, ঝাল ঝোল কিংবা বেগুন-আলুর সঙ্গে মিশিয়ে রান্না করা পদগুলো হয়ে ওঠে খাবারের প্রধান আকর্ষণ।
স্থানীয়দের ভাষায়, ‘টানা গোশত খাইলে আর মুখে রুচি থাকে না। তখন একটু ঝাল-মশলাদার চ্যাপা শুঁটকি হইলেই ভাতের থালা পরিষ্কার’।
হাওরের ঘরে ঘরে চ্যাপা শুঁটকির ঘ্রাণ
ঈদের পর গ্রামের রান্নাঘরে সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় চ্যাপা শুঁটকি ভর্তা। পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, সরিষার তেল আর ধনেপাতা দিয়ে মাখানো এই ভর্তা গরম ভাতের সঙ্গে খেতে পছন্দ করেন প্রায় সবাই। এ ছাড়া জনপ্রিয় কিছু পদ হলো চ্যাপা শুঁটকি ভুনা, আলু-বেগুন দিয়ে চ্যাপা শুঁটকির তরকারি, কচুশাকের সঙ্গে শুঁটকি, শুকনা মরিচে ঝাল শুঁটকি চচ্চড়ি, টমেটো দিয়ে টক-ঝাল শুঁটকির তরকারি।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার শোলাকিয়ার গৃহিণী জাহানারা বেগম ও নীলগঞ্জ সড়কের দিলারা বেগম জানান, ঈদের পর রান্নায় একটু টক, ঝাল আর ধোঁয়াটে স্বাদ আনতেই চ্যাপা শুঁটকি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অনেক পরিবারে অতিথি আপ্যায়নেও তখন মাংসের বদলে শুঁটকির বিশেষ আয়োজন দেখা যায়।
বাজারেও বাড়ে চাহিদা
ঈদের পর হাওরাঞ্চলের স্থানীয় বাজারে চ্যাপা শুঁটকির বিক্রি বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানির ঈদের তিন-চার দিন পর থেকেই মানুষ আবার শুঁটকি কিনতে শুরু করেন।
কয়েকজন বিক্রেতার ভাষ্য, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় ঈদের পর দুই সপ্তাহ শুঁটকির চাহিদা বেশি থাকে। বিশেষ করে ছোট মাছের চ্যাপা শুঁটকি, লইট্টা শুঁটকি ও মলা শুঁটকি দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
শুধু খাবার নয়, হাওরের সংস্কৃতির অংশ : হাওরাঞ্চলে চ্যাপা শুঁটকি শুধু একটি খাবার নয়; এটি স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের অংশ। বর্ষা মৌসুম, নৌকার জীবন, মাছ ধরা আর সংরক্ষণের দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই খাবার।
তাই কোরবানির ঈদের মাংসের উৎসব শেষে যখন মানুষ স্বাদ বদলের খোঁজে থাকে, তখন চ্যাপা শুঁটকি হয়ে ওঠে হাওরবাসীর নির্ভরতার নাম। টানা গোশতের ভার কাটিয়ে ঝাল-ঝাঁজালো শুঁটকির স্বাদেই যেন আবার ফিরে আসে রুচি আর তৃপ্তি।