× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাটে হাটে পশুর রাজত্ব

কোরবানির বাজারে ‘ট্রাম্প’ ও ‘নেতানিয়াহু’র পাশে ‘নেইমার’

প্রবা প্রতিবেদন

প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬ ১৮:০৬ পিএম

কোরবানির বাজারে ‘ট্রাম্প’ ও ‘নেতানিয়াহু’র পাশে ‘নেইমার’

বাংলার চিরায়ত লোকজ দর্শন ও বাউলতত্ত্বে সব সময়ই দেহের ভেতরের ষড়রিপুকে (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) বিসর্জন দিয়ে আত্মশুদ্ধির কথা বলা হয়েছে। কোরবানির মূল শিক্ষাও তাইÑ কেবল পশুকে নয়, বরং মানুষের ভেতরের অহংকার ও পশুপ্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়া।

তবে এই ত্যাগের মহিমায় বাহ্যিক যে অনুষঙ্গটি আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি উৎসব ও আনন্দ নিয়ে আসে, তা হলো কোরবানির পশুর হাট। ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশে এখন সাজ সাজ রব। প্রতিটি হাটে ও খামারে নজর কাড়ছে বিশালদেহী সব গরু, মহিষ, এমনকি উট ও দুম্বা। 


দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদকরা পাঠকদের জন্য কোরবানির বিশেষ কিছু পশুর গল্প তুলে ধরে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। বিশেষ করে, নাম ও ওজনে অন্যদের থেকে সহজেই আলাদা করা যায়, এমন কিছু আলোচিত পশুর কথা থাকছে এই প্রতিবেদনে। 

এবার কোরবানির পশুর নামকরণে খামারিরা দেখিয়েছেন দারুণ সৃজনশীলতা। বিশাল আকৃতির এসব পশুর নামগুলো হাটের বাড়তি আকর্ষণ। যেমনÑ নারায়ণগঞ্জের আলোচিত দুই গোলাপি রঙের অ্যালবিনো মহিষের নাম রাখা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নামে। আবার যশোরের অভয়নগরে আছে ব্রাজিলিয়ান তারকার নামের ষাঁড় ‘নেইমার’, বরিশালে আছে ডব্লিউডব্লিউই কুস্তিগিরের নামে ‘রিকিশি’। অন্যদিকে নামে রাজকীয় মেজাজও আছে; যেমন দিনাজপুরের ‘সম্রাট’, বিরামপুরের ‘মহারাজা’, কলাপাড়ার ‘রাজা বাহাদুর’ ও চাটমোহরের ‘বাহারাম বাদশা’। কিশোরগঞ্জে নাম ছড়িয়েছে ‘কামিনী’ ও ‘মোস্তাক’ জুটি। আছে শাহরাস্তির ‘জোড়া কিং’, টেকনাফের ‘লাল-সাদা বাদশা’ ও মৌলভীবাজারের তিন ‘কালো মানিক’। 

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী গল্প ‘মহেশ’-এ গফুর মিয়া তার ষাঁড়টিকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি ভালোবাসত। গফুর ও মহেশের সেই অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি আজও দেখা যায় বাংলার প্রতিটি খামারির ঘরে। নিজেদের ঘাম আর শ্রম দিয়ে সন্তানের মতো লালন-পালন করে একেকটি পশুকে কোরবানির হাটের জন্য প্রস্তুত করেন তারা। যখন বিক্রির সময় ঘনিয়ে আসে, তখন খামারিদের বুকটা হাহাকার করে ওঠে।

বরিশালের এমইপি অ্যাগ্রোর ১১০০ কেজি ভরের ‘রিকিশি’র পরিচর্যাকারী শাহাদাত যেমন আবেগাপ্লুত হয়ে নিজস্ব প্রতিবেদক শাকিল মাহমুদকে বলেন, ‘নিজের সন্তানের মতো ওকে লালন-পালন করেছি। বিক্রি হয়ে গেলে নিজেকে কীভাবে সামলাব, জানি না।’ একই চিত্র কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায়। ১৭ বছর আগে স্বামী হারানো হোসনা বেগম জীবনসংগ্রামের অংশ হিসেবে ভাইয়ের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন খামার। সেখানে তিন বছর ধরে মায়া দিয়ে বড় করেছেন ১২০০ কেজির ‘কামিনী’ ও ১৩০০ কেজির ‘মোস্তাক’কে। সম্মিলিতভাবে ৬২ মণ ওজনের এই ষাঁড় জুটির দাম হাঁকা হচ্ছে ২০ লাখ টাকা। হোসনা বেগম প্রতিবেদক সাইফুল হক মোল্লাকে বলেন, ‘তিন বছর ধরে অনেক কষ্ট আর মায়া দিয়ে নিজের সন্তানের মতো এদের বড় করেছি।’

বেনাপোল (যশোর) প্রতিবেদক মহসিন আলী জানিয়েছেন, মরুর উট, দুম্বা ও অ্যালবিনো মহিষ পশুর চিরায়ত হাটে এবার ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে শার্শা উপজেলার পুটখালী ও বাগআঁচড়া অঞ্চলে। তরুণ উদ্যোক্তা তাসনীম জুবায়েরের খামারে ৩৫টি দুম্বা আর খামারি নাসির উদ্দীনের খামারে ১৫টি উট রয়েছে। এরই মধ্যে তাদের ৫টি উট ও ৭টি দুম্বা বিক্রিও হয়ে গেছে। একেকটি উট ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকায় এবং দুম্বা প্রায় অর্ধলাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উট দেখতে এদেশের আবহাওয়ায় বেমানান মনে হলেও প্রাকৃতিক খাবারেই এরা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ প্রতিবেদক এম আর কামাল জানিয়েছেন, এলাকায় আলোচনার তুঙ্গে গোলাপি রঙের অ্যালবিনো জাতের দুই বিশাল মহিষ। বন্দর এলাকার খামারে বদমেজাজি স্বভাবের কারণে ৭০০ কেজির মহিষটির নাম দেওয়া হয় ‘নেতানিয়াহু’, যা সাড়ে ৬ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছেন ঢাকার এক রাজনীতিক। আর পাইকপাড়ার খামারে থাকা অপর মহিষ ‘ট্রাম্প’ বিক্রি হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়।

চাটমোহর প্রতিবেদক সঞ্জিত চক্রবর্তী জানিয়েছেন, এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ৪০ মণ ওজনের ‘বাহারাম বাদশা’; খামারি মিনারুল ইসলাম এর দাম চাইছেন ২৫ লাখ টাকা। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী প্রতিবেদক প্লাবন শুভ জানিয়েছেন, উপজেলায় নজর কাড়ছে ২৭ মণের ‘দিনাজপুরের সম্রাট’; খামারি আবদুর রাজ্জাক এর দাম হাঁকাচ্ছেন ১২ লাখ টাকা। প্রতিদিন তাজা ঘাস, খুদের ভাতের পাশাপাশি আপেল, কলা, গাজরের মতো ফল খেয়ে বড় হয়েছে সম্রাট। গরম থেকে বাঁচাতে এর জন্য রয়েছে সার্বক্ষণিক ফ্যানের ব্যবস্থা। হিলি প্রতিবেদক মোকছেদুল মমিন মোয়াজ্জেম জানিয়েছেন, একই জেলার বিরামপুরে ১২০০ কেজি ওজনের ‘মহারাজা’র দাম হাঁকা হচ্ছে ২০ লাখ টাকা। দূর থেকে দেখলে এটিকে ছোটখাটো হাতির মতোই মনে হয়।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় নজর কাড়ছে ৪৫ মণ (প্রায় ১৮০০ কেজি) ওজনের বিশাল ষাঁড় ‘কালো মানিক’। ১১ ফুট লম্বা ও ৬ ফুট উচ্চতার এই ষাঁড়ের দাম হাঁকা হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। মির্জাগঞ্জ প্রতিবেদক কামরুজ্জামান বাঁধন জানিয়েছেন, উপজেলার উত্তর ঝাটিবুনিয়া গ্রামের সোহাগ মৃধা গত বছর তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে এটি উপহার হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন। একই জেলার কলাপাড়ায় ১৫ মণের ‘রাজা বাহাদুর’-এর দাম চাওয়া হচ্ছে ৫ লাখ টাকা। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. মারুফ বিল্লাহ কলাপাড়া প্রতিবেদক গোফরান পলাশকে বলেন, ‘ষাঁড়টি লালন-পালনে আমরা কামাল গাজীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে এটিকে বড় করা হয়েছে।’

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় ১৪০০ কেজি ওজনের ‘বাদশা’র দাম হাঁকা হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘বাদশা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে বেড়ে ওঠা বিশাল আকৃতির একটি ষাঁড়। কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পেতে আমরা অনলাইনে ছবিসহ পোস্ট করে প্রচার চালিয়েছি।’

নোয়াখালীতে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শাহিওয়াল জাতের ২৫ মণের ‘রাজাবাবু’ (দাম ১৩ লাখ টাকা) ও ২৩ মণের ‘বাহাদুর’ (দাম ১১ লাখ টাকা)। প্রতিবেদক হাসিব আল আমিনকে খামারি নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবারেই বড় হয়েছে এরা।’ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তাসলীমা ফেরদৌসীও একই কথা বলেছেন। 

টেকনাফের ‘লাল বাদশা’ ও ‘সাদা বাদশা’ নামের দুটি ষাঁড়, মৌলভীবাজারের তিন ‘কালো মানিক’, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ‘মহারাজা’ ও ‘রাজাবাবু’, চাঁদপুরের জোড়া ষাঁড় ‘শাহরাস্তি কিং-১’ ও ‘শাহরাস্তি কিং-২’ও ক্রেতা ও দর্শনার্থীর নজর কেড়েছে। 

দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে উঠে আসা এসব খামারির কথায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, পশুপালনে ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা ইনজেকশনের ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে। খামারিরা দেশীয় ঘাস, খড়, ভুসি, খৈল ও ফলমূল খাইয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে পশু মোটাতাজা করছেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, বরিশালসহ প্রায় প্রতিটি জেলাতেই এবার চাহিদার তুলনায় কোরবানির পশুর উৎপাদন বেশি হয়েছে।

কোরবানির পশুর হাট কেবল বেচাকেনার জায়গা নয়; এটি খামারির সারা বছরের স্বপ্ন, শ্রম ও ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রদর্শনী। বিশাল এসব পশুর হাটে ক্রেতার দরদাম আর দর্শনার্থীদের ভিড় ঈদের আনন্দকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। খামারিদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম আর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই মূলত পূর্ণতা পায় কোরবানির প্রকৃত আনন্দ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা