ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬ ১৪:০৮ পিএম
আপডেট : ২১ মে ২০২৬ ১৪:২৪ পিএম
মৌলভীবাজারের ছনগাঁও গ্রামে অবস্থিত চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টিলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়ামের থাকা মণিপুরি নিদর্শনের একাংশ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় দুই দশক আগে গড়ে ওঠে ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টিলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’।
বাংলাদেশের মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রায় তিনশ বছরের লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও গ্রামে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি বর্তমানে অর্থাভাবে অনেকটাই থমকে গেছে।
ছায়াঘেরা নিভৃত পল্লী ছনগাঁওয়ে অবস্থিত মায়াময় এ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেন সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হামোম তনুবাবু। বর্তমানে ৮২ বছর বয়সের এই প্রবীণ ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন।
নিজের বাড়ির একটি কক্ষে শুরু হওয়া সংগ্রহশালাটি এখন বাড়ির চারটি কক্ষে বিস্তৃত। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে মণিপুরিদের শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী প্রায় তিন শতাধিক বিলুপ্ত ও বিলুপ্তপ্রায় নিদর্শন।
অযত্নে পড়ে আছে অনেক দুর্লভ নিদর্শন
দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন এই জাদুঘরে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মণিপুরি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার জন্য এখানে আসেন।
তবে জাদুঘরের নামে জমি দান করা হলেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে নতুন ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক দুর্লভ নিদর্শন অযত্নে পড়ে আছে।
নিজ বাড়িতেই সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন হামোম তনুবাবু
জাদুঘরটির প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা ও সংগ্রামের ইতিহাস।
২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ‘বাংলাদেশের লোক সংস্কৃতি শনাক্তকরণ ও মূল্যমান নির্ধারণ এবং মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মণিপুরি লোকসংস্কৃতির ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হামোম তনুবাবু।
এর আগে ২০০৫ সাল থেকে তিনি বিভিন্ন মণিপুরি অধ্যুষিত এলাকায় ঘুরে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।
তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, মণিপুরী লোকসংস্কৃতির বহু নিদর্শন হারিয়ে যাচ্ছে। তখন থেকেই তিনি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন।
গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রবীণ মণিপুরি ব্যক্তিদের সহায়তায় সংগ্রহ করতে থাকেন নানা ঐতিহ্যবাহী দ্রব্যাদি। একসময় নিজ বাড়িতেই গড়ে তোলেন বিশাল সংগ্রহশালা।
২০০৬ সালের ১ অক্টোবর কবি দিলওয়ার ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইন্টিলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
এরপর হামোম তনুবাবু আরও ব্যাপকভাবে সংগ্রহ অভিযান শুরু করেন। মণিপুরিদের কৃষিকাজ, তাঁত, বিনোদন, খেলাধুলা, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা নিদর্শন সংগ্রহে তিনি ঘুরে বেড়ান বাড়ি থেকে বাড়ি।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১২ মে বাংলা একাডেমির তৎকালীন পরিচালক ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক মুহাম্মদ নুরুল হুদা জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে মণিপুরীদের প্রাচীন নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী, কৃষিকাজের উপকরণ, মাছ ধরার সরঞ্জাম, তাঁতের যন্ত্রপাতি, বাদ্যযন্ত্র, অলংকার, পোশাক ও ধর্মীয় উপকরণ। এর মধ্যে রয়েছে ‘মীতৈ ময়েক মপি’ বর্ণমালা, ‘ফিংগারুক’, ‘চেংজাসুক’, ‘য়াংকুক’, ‘ঙা-খারাই’, ‘লোং’, ‘তুংগোল’, ‘পোলাং’, ‘লুবাক’, ‘মেরুক’, ‘শেলুক’, ‘চিল্লুপ’, ‘মোইথাপ-লূ’সহ অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী দ্রব্য।
এর পাশাপাশি মণিপুরি বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যেমন ‘পাংদেশ’, ‘লংচাক’, ‘শিংসাপ’, ‘নাচৈ’, ‘শনম’, ‘পুং’, ‘শেল’, ‘মোইবুং’, ‘মন্দিলা’, ‘পুংজাও’, ‘তৌদ্রি’ ও ‘পেনা’ সংরক্ষিত রয়েছে এখানে।
জাদুঘরে মণিপুরী নারীদের ব্যবহৃত গহনা, বিয়ের পোশাক, নৃত্যের পোশাক, পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী ধুতি, ওড়না, তাঁতে তৈরি কাপড়, শিশু বহনের কাপড়, বিছানার চাদর, কাঁধে ব্যবহৃত কাপড়সহ অসংখ্য দুর্লভ বস্ত্র সংরক্ষিত আছে।
এখানে আরও রয়েছে মণিপুরিদের সাতটি গোত্রের দা, যুদ্ধের সরঞ্জাম, তীর-ধনুক, বিয়েতে ব্যবহৃত সামগ্রী, শুটকি রাখার নাঙ্গা, মুসলিম মণিপুরী বিয়ের ছাতা, রাধা-কৃষ্ণ-ললিতার মূর্তি এবং শতবর্ষী বিভিন্ন পোশাক।
সবার জন্য উন্মুক্ত
জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রবেশ ফি মাত্র ২০ টাকা। সপ্তাহের সাত দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খোলা থাকে এটি। দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ এখানে এসে মণিপুরি সম্প্রদায়ের শত শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন।
জাদুঘরের বর্তমান পরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতার ভাই কবি সনাতন হামোম বলেন, আমার ভাই হামোম তনুবাবু জাদুঘরের জন্য জমি দিয়েছেন। কিন্তু অর্থাভাবে বড় পরিসরের ভবন নির্মাণ করা যাচ্ছে না।
ইউনেস্কো পুরস্কারপ্রাপ্ত। এই জাদুঘরে যাওয়ার সড়কটিও এখনো কাঁচা। বর্ষায় চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে অন্তত একটি বড় ভবন নির্মাণ ও রাস্তা পাকাকরণ করা হলে এই জাদুঘরটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
যেভাবে যেতে হয় জাদুঘরটিতে
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ট্রেনে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ অথবা শমশেরনগর স্টেশনে নেমে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস বা সিএনজি অটোরিকশায় কমলগঞ্জ চৌমুহনায় যেতে হবে। সেখান থেকে দক্ষিণমুখী সড়ক ধরে প্রায় ৭ কিলোমিটার গেলেই আদমপুর বাজার।
আদমপুর বাজার থেকে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় প্রায় ৩ কিলোমিটার গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দিলেই ছনগাঁও গ্রামে পৌঁছানো যায়। সেখানেই অবস্থিত ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরী ইন্টিলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’।
মৌলভীবাজার বা শ্রীমঙ্গল থেকেও ভাড়ায় চালিত যানবাহনে সরাসরি জাদুঘরে যাওয়া যায়। আদমপুর বাজার থেকে বৈদ্যুতিক রিকশায় যেতে ভাড়া লাগে প্রায় ১০০ টাকা।